photo_2020-08-23_01-24-59 (3)

উম্মাহ যার ইলম থেকে বঞ্চিত

শাইখ আব্দুল আজীজ আত তারিফী (আল্লাহ তাঁর মুক্তিকে তরান্বিত করুন) এই মানুষটার কথা চিন্তা করলে আমার কান্না চলে আসে। কেন কান্না আসে জানেন? কারণ উম্মাহ তাঁর ইলম থেকে বঞ্চিত। সৌদি জালেম সরকার আমাদেরকে তাঁর ইলমের ব্যাপ্তি থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। ইলমের তুলনায় তাঁর বয়স বেশি না। তাঁর সমবয়সী স্কলারদের কাউকে আমি শাইখের সমকক্ষ হিসেবে পাইনি। আর থাকলেও হতে পারে সেটা আমার জানার বাইরে।

শাইখ ১৯৭৬ সালে কুয়েতে জন্মগ্রহণ করেন। খুব ছোট বয়সেই সেখান থেকে মক্কায় চলে আসেন। পরবর্তীতে মক্কা নগরীকে আর ত্যাগ করেননি। ছোটকালেই তিনি মেধার প্রখরতার সাক্ষী রাখেন। ১৩ বছর বয়স থেকেই ইসলামী জ্ঞান শাস্ত্রের বিভিন্ন মতন তথা ট্যাক্সট বুক মুখস্থ করা শুরু করে দেন। ১৫ বছরে এসে তার মুখস্তের সীমানায় অসংখ্যা মতন কিতাব চলে আসে। দিনের অধিকাংশ সময়ই ইলমের অন্বেষণে কাটত। সময় নষ্ট করার মত কোন বিষয় তাঁর অভিধানে ছিল না। ফলশ্রুতিতে মাত্র ১৭ বছর বয়সেই তিনি ইবনে কাসীর, যাদুল মা’আদ সহ আরো কিছু বিশাল কলেবরের মতন কিতাবের সংক্ষিপ্ত রূপ লিপিবদ্ধ করে ফেলেন।

রিয়াদের জামিয়াতুল ইমাম মুহাম্মাদ বিন সউদ থেকে তিনি স্নাতক লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জীবন শেষ করে তিনি সৌদির ইসলামিক এফেয়ার্স এন্ড গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ে গবেষণা ও দাওয়াতের কাজে নিযুক্ত হোন। পরবর্তীতে সেখানে কিছু বিষয়ে শাইখের মতবিরোধ হওয়ায় বেরিয়ে আসেন। তবে তার ইলমের সফর থেমে যায়নি। ইলমের জন্য তিনি মুসলিম বিশ্বের নানাপ্রান্তে সফর করেন। মিশর, তিউনিসিয়া এমনকি আমাদের হিন্দুস্থানেও তাঁর ইলমী সম্পর্ক ছিল। ইলমী সফরগুলোর মধ্যে তাঁর জীবনে সবচেয়ে প্রভাবক রিহলাহ ছিল হিন্দুস্তানে। ফলে এখানে তিনি দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। উপমহাদেশের অন্যতম শাইখুল হাদীস এবং জগতবিখ্যাত সীরাতগ্রন্থ “আর রাহীকুল মাখতুম” এর লেখক আল্লামা সুফিউর রহমান মোবারকপুরী রহিমাহুল্লাহর কাছ থেকেও তিনি ইলম অর্জন করেন। এখানের ইলম ও তাযকিয়ার পরিবেশ তাঁকে মুগ্ধ করে। সুফিউর রহমান রহমান মোবারকপুরী সহ তাঁর বিখ্যাত উস্তাদদের মধ্যে রয়েছেন শাইখ আব্দুল আজীজ বিন বায, শাইখ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল আজীজ বিন আক্বীল, শাইখ আব্দুর রহমান বিন নাসির, শাইখ আব্দুল কারীম আল খুদাইর সহ আরো অনেক বিখ্যাত মাশায়েখ।

শাইখ আব্দুল আজীজ আত তারিফী ফাঃআঃ এর প্রশ্নোত্তর এবং খণ্ডন পদ্ধতি অত্যন্ত চমৎকার ও শক্তিশালী। কুরআন, সুন্নাহ এবং আক্বওয়ালে সালাফের সমাহার ঘটিয়ে দিতেন। তাঁর হিফজুন নুসুস আমাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করে তোলে। অনর্গল মুখস্ত নুসুস বলতেই থাকেন। তাঁর আরেকটা গুণ হল, নাওয়াযিল তথা সমসাময়িক বিষয়ের শর’য়ী সমাধানে খুব পারঙ্গম ছিলেন। আর লেখালেখির কথায় আসলে বলা যায়, শাইখ ইসলামী জ্ঞান শাস্ত্রের অধিকাংশ বিষয়েই কলম ধরেছেন। উলুমুল আক্বায়েদ, উলুমুল কুরআন, উলুমুল হাদীস, উলুমুল ফিকহ এই চারো বিষয়ে তাঁর গ্রন্থ-প্রবন্ধ রয়েছে। এমনকি সমসাময়িক মতবাদসমূহ বিশেষত পাশ্চাত্য সভ্যতার ব্যাপারেও তিনি খুব সচেতন ছিলেন। পাশ্চাত্য লিবারিলেজম নিয়ে তাঁর স্বতন্ত্র এক গ্রন্থই আছে। শাইখের লিখিত মুআল্লাফাতের সংক্ষিপ্ত তালিকা:

১। আত তাহজীল ফী তাখরীজি মা লাম ইয়াখরুজ মিনাল আহাদীসি ওয়াল আসারী ফী ইরওয়ায়িল গলীল। (সৌদি প্রকাশনা জগতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইলমী কাজ। কিতাবটি ২ খণ্ডে মাকতাবাতুর রুশদ রিয়াদ থেকে প্রকাশিত হয়।)
২। যাওয়ায়িদু সুনানি আবি দাঊদ ওয়াল কালামা আলা বা’দ্বি ইলালি হাদীসিহি।
৩। শরহু হাদীসি জাবির ফী হুজ্জাতিন নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
৪। আল ই’লাম বি শরহি নাওয়াক্বিদিল ইসলাম।
৫।তাওহিদুল কালিমাতি আলা কালিমাতিত তাওহীদ।
৬। আল উলামা ওয়াল মীসাক
৭। আল গিনা ফীল মীযান
৮। আল মু’তাযিলাতু ফীল ক্বদীমি ওয়াল হাদীস
৯। আত তাকরীর ফী আসানিদিত তাফসীর
১০। সিফাতু সালাতিন নাবিয়্যি
১১। ইদ্বতিরাবুয যমান
১২। আল আরবাঊনান নাবাওউয়িযাহ ওয়াত তা’লীকু আলাল মা’লুলি মিনহা
১৩। আল মাসায়িলুল মুহিম্মাহ ফিল আযানি ওয়াল ইক্বামাহ
১৪। আর হুররিয়্যাতু বাইনাল ফিকরি ওয়াল কুফরি। (এটা প্রকাশের অনুমতি দেয়া হয়নি)
১৫। আল ইখতিলাতু তাহরীরুন ওয়া তাকরীরুন ওয়া তা’কীবুন। ( এই বইটি ২০১০ সালে রিয়াদে ফাস্ট বেস্ট সেলার বইয়ের মর্যাদা লাভ করে)
১৬। আল আক্বলিয়্যাতুল লিবরালিয়্যাতু ফী ওয়াসফিল আক্বল ওয়ান নাক্বল
১৭। আল হিজাবু ফিশ শর’য়ী ওয়াল ফিতরাহ
১৮। আত তাফসীরু ওয়াল বায়ানু লি আহমাকিল কুরআন। ( পুরো কুরআনের চমৎকার একটি তাফসীর গ্রন্থ। প্রায় ৫ খণ্ডে কিতাবটি সমাপ্ত হয়েছে। সালাফদের তাফসীরের গ্রন্থসমূহের সারনির্যাস বলতে পারেন, সাথে সমসাময়িক তাদাব্বুর)
১৯। আল মাগরিবিয়্যাতু ফী শরহি আক্বীদাতিল ক্বিরওয়ানিয়্যাহ
২০। আল খুরাসানিয়্যাতু ফী আক্বীদাতির রাযীয়্যিন
২১। আল ফাসলু বাইনান নাফসি ওয়াল আক্বল।
২২। শরহু মুফীদিল মুস্তাফিদ ফী কুফরি তারিকিত তাওহীদ
২৩। শরহু কিতাবীত তহারাহ মিন বুলুগিল মারাম।
২৫। আসতুরুন ফিল নাকলি ওয়াল আকলি ওয়াল ফিকরি
২৬।আযকারুস সবাহী ওয়াল মাসা

কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল, শাইখের ইলমী খেদমতের স্রোত যখন দুরন্ত গতি লাভ করে ঠিক সেই মুহূর্তেই জালেম সৌদি সরকার তাঁকে কারাগারে বন্দি করে ফেলে। ২০১৬ সালের ২৩ই এপ্রিল শাইখকে আটক করা হয়। শাইখকে আটক করার পর একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, তিনি কোন এক জায়গায় কিছু বিষয় সমাধানের জন্য অবস্থান করছেন। তাকে আটক করা হয়নি। কিন্তু আজ পর্যন্ত তিনি সেই সমাধানের জায়গাতেই আছেন। সেখান থেকে আর ফিরে আসতে পারেননি। শাইখের অপরাধ ছিল সৌদি সরকারের আমেরিকা প্রীতির সমালোচনা করা। মুসলমানদের বিরুদ্ধে আমেরিকাকে সাহায্য করা, সৌদিকে পাশ্চাত্য সভ্যতার ধাচে সাজানো, আমেরিকার সাথে মিলে ইসলামী বিশ্বাসের মৌলিক বিষয়গুলোতে বিকৃতি সাধণের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি জঘণ্য কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করার কারণে সৌদি সরকার শাইখকে উম্মাহর কাছ থেকে কেড়ে নেয়। একই অপরাধে সৌদির জেলেগুলোতে উম্মাহর অনেক রত্ন বন্দিজীবন পার করছেন। তাদের তালিকা অনেক দীর্ঘ, এখানে লেখার ফুরসত হবে না।

শাইখ আব্দুল আজীজ আত তারিফীর বন্দি জীবনের পাঁচ বছর চলছে। মাঝখানের চারটি বছর যদি তিনি মুক্ত থাকতেন এবং সর্বোপরি আল্লাহ তাওফিক দিতেন, তবে উম্মাহ তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু পেত। শাইখের খিদমতের তালিকা আরো দীর্ঘ হত। দুনিয়াতে আলেম তো অনেক আছে। কিন্তু মুহাক্কিক এবং মুখলিস আলেমের সংখ্যা খুবই নগণ্য। উম্মাহর জন্য আজ এসব মুহাক্কিক ও মুখলিস আলেমের প্রয়োজন অনেক। আমরা দোয়া করি, তিনি শাইখকে আমাদের মাঝে আবার ফিরিয়ে দিক। পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা হকপন্থী বন্দি আলেমদের মুক্তির ব্যবস্থা করুন। দুনিয়ার মুহাক্কিক এবং মুখলিস আলেমদের ছায়া উম্মাহর উপর দীর্ঘ করুন। আমিন।

Leave A Comment

You must be logged in to post a comment