photo_2020-08-23_01-24-59 (4)

ইসলামে ন্যায়ের ধারণা

মূল : যাহিদ সিদ্দিক মুঘল

অনুবাদ : ইফতেখার সিফাত

ইসলাম ন্যায়ের ধর্ম। ন্যায় অর্জনই ইসলামের প্রধান উদ্দেশ্য। ইসলাম সর্ব ক্ষেত্রেই ন্যায়ের পথকে গ্রহণ করতে নির্দেশ করে।

এই বাক্যগুলোকে দুইভাবে ব্যাখ্যা করা যায় —

এক. ন্যায়ের ধারণা শরিয়াতের বিধান গ্রাহ্য হওয়ার জন্য পৃথক এক মূলনীতি। এর জন্য নবী রাসুলদের দিক-নির্দেশনা এবং ওহীর প্রয়োজনীয়তা অপ্রসঙ্গিক।

দুই. শরিয়াত ন্যায়কে গ্রহন করে এই অর্থে যে, স্বয়ং শরিয়াতই একমাত্র ন্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করে।

ইসলামের দৃষ্টিতে কেবল দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটিই গ্রহনযোগ্য হতে পারে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ইসলাম ন্যায়-নিষ্ঠার ধর্ম। কিন্তু জানার বিষয় হল ন্যায়-নিষ্ঠা কী? ন্যায়-নিষ্ঠা কাকে বলে? এটা কে ঠিক করবে? এবং এর মাপকাঠি  কী? ন্যায়ের সরল সংজ্ঞা হল, হকদারের হক আদায় করা। অর্থাৎ যে যেই  বিষয়ের উপযুক্ত তাকে সেটা ফিরিয়ে দেয়া। এই সংজ্ঞার পর প্রশ্ন আসে কে কীসের উপযুক্ত এটা কীভাবে জানা যাবে? এই ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অবস্থান হল, যখন আল্লাহ তায়ালা ইসলামকে ন্যায়ের পথ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন তখন তিনি মৌলিকভাবে ন্যায় ও অবিচারের মাঝে পার্থক্যকারী মাপকাঠিও প্রদান করেছেন। তিনি এই মাপকাঠি নবী-রাসুলদের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। যার মাধ্যমে মানুষ ন্যায়ের পথে চলতে পারবে। আর এই মাপকাঠি অপরিবর্তনীয় ও তার মূল অবস্থায় কুরআন-সুন্নাহ এবং ইজমার মাধ্যমে সংরক্ষিত আছে। এটাকেই আল্লাহ তায়ালা ভাল-মন্দ, ন্যায়-অবিচার এবং মধ্যম পন্থার মাপকাঠি  হিসাবে প্রদান করেছেন।[১] কেবল মানবিক অনুভূতি ও বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে এই মাপকাঠি অনুধাবন করা যাবে না।

বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোন মানুষ তার বিবেক, অনূভুতির সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিলেই খোদায়ী এবং ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশের প্রয়োজনীয়তা অনূভব করবে। এরিস্টটল এবং প্লেটোর মত দার্শনিকদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল দুই প্রান্তিকতার মধ্যবর্তী কাজটি হল সঠিক কাজ। কিন্তু সেই মধ্যবর্তী কাজটি কী? সে ব্যাপারে কোন সুষ্পষ্ট পার্থক্য তারা দেখাতে পারেনি। যেসব খ্রিষ্টান এবং মুসলিম চিন্তাবিদরা এরিস্টটল এবং অন্যান্যদের দর্শনের উপর নির্ভর করল, তারা নবীদের প্রয়োজনীয়তা মেনে নিতে সমস্যা অনূভব করল। শেষ পর্যন্ত তারা এই সমঝোতায় পৌছল যে, নবীগণ এবং দার্শনিকদের উদ্দেশ্য হল, ভাল-মন্দের মাঝে পার্থাক্যকে সুষ্পস্ট করা। পার্থক্য হল, নাবীদের পদ্ধতি সরল এবং সহজ। এজন্য এটা সাধারণ লোকদের জন্য উপযুক্ত। পক্ষান্তরে দার্শনিকদের পদ্ধতি কঠিন এবং বুঝতে মুশকিল। এজন্য এটা বিশেষ ব্যাক্তিদের জন্য। যেন দার্শনিকদের পদ্ধতি নবীদের চেয়ে উত্তম। (নাউযুবিল্লাহ)

মুসলিম দুনিয়ার মধ্য থেকে ফারাবি, ইবনে সীনা  এবং খ্রিষ্ট দুনিয়া থেকে একুইনাস ও অগাস্টিনের মত দার্শনিকরা গ্রীক দর্শনকে ইসলাম এবং খ্রিস্ট ধর্মের সাথে মিলানোর চেস্ট করল।  কিন্তু ইমাম গাজালী রহ. এই প্রচেস্টাকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি এই ধরনের দায়ির অন্তসারশূন্যতাকে স্পস্ট করে দিলেন। ইমাম গাজালি রহ. আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের ভাষ্যকার হয়ে বলেন, ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি মধ্যমপন্থার মাঝে পার্থক্যের সীমারেখাকে জানতে মানুষের আকল পরিপূর্ণ অপারগ। এসব দার্শনিকদের দাবিকে মেনে নেয়ার অর্থ হল নবী-রাসূলদের শিক্ষাকে প্রত্যাখ্যান করা।

ইসলামি শরিয়াতই একমাত্র পদ্ধতি যার মাধ্যমে আমরা ভাল-মন্দ, শুদ্ধ-অশুদ্ধ, ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি।আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের কাছে এমন কোনো নিরপক্ষ কাঠামো নেই, যার মাধ্যমে শয়ীয়াতকে কাঠগড়ায় দাঁড় করা যেতে পারে যে, ইসলাম ন্যায় নাকি অন্যায়,বাড়াবাড়ি নাকি মধ্যম পন্থা। কারণ ইসলামই ন্যায়-অবিচার নির্ধারনের একমাত্র মাপকাঠি।

এজন্য “ন্যায় কী” এই প্রশ্নের উত্তর হবে শরিয়াত। সহজ কথা হল, যখন প্রত্যেক বিষয়ে স্বয়ং শরিয়তই ন্যায়-অন্যায়ের সংজ্ঞা নির্ধারণ করবে তখন বিধান গ্রহন করার জন্য পৃথক ভাবে আকলকে মূলনীতি হিসাবে গ্রহন করার কী যৌক্তিকতা রয়েছে? অর্থাৎ যখন স্বয়ং শরীয়াতই স্পস্ট করে দিবে কোনটা ন্যায় কোনটা অন্যায়, কোনটা ভাল আর কোনটা মন্দ, তখন আদালা করে ন্যায়কে ভিত্তি বানানো ভিন্ন কিছু দাবি করে। এটার দ্বারা বুঝা যায় শরিয়াতকে জাস্টিফাই করার জন্য শরীয়াহ বহির্ভূত কোন মাপকাঠি আছে। যদি আল্লাহর বিধান মোতাবেক কাজ করাই ন্যায় হয়ে থাকে তাহলে শরিয়াতকে বাদ দিয়ে আকলকে মূলনীতি হিসাবে মেনে নেয়া অসম্ভব।

স্বরণ রাখা চাই ইসলামই ন্যায়ের একমাত্র নাম। কুফুর পুরোটাই অন্যায় এবং অবিচার। জুলুমের অর্থ হল দেখানো পথ থেকে সরে যাওয়া। এজন্যই পবিত্র কুরআনে ইরশাদ  হয়েছে, যে লোকেরা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক ফায়সালা দেয়না তারা জালেম। [২]

আল্লাহ তায়ালা সূরা নিসার ৫৮ নাম্বর আয়াতে বলেন, “যখন তোমরা লোকদের মাঝে ফায়সালা করবে তখন তোমরা ন্যায়সঙ্গত ফায়সালা  করো”।

এখানে ন্যায়সঙ্গত ফায়সালা দ্বারা কী উদ্দেশ্য? সেটার সুস্পস্ট বিবরণ রাসূল সা. এর একটি হাদিসে পাওয়া যায়। আলী রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, “এটি আল্লাহর কিতাব যার মাঝে রয়েছে পূর্ববর্তীদের ঘটনা এবং তোমাদের পরবর্তী ঘটনাবলীর সংবাদ। এই কিতাব তোমাদের মাঝে সবকিছুর ফায়সালাকারী। এটা ফেলে রাখার মত কোন কিতাব নয়। যে ব্যক্তি এই কিতাবের ভিত্তিতে কথা বলবে, সে সত্যবাদী। যে এর উপর আমল করবে, সে প্রতিদান পাবে। আর যে এই কিতাব অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দিবে, সেই ন্যায়পরায়ন। [৩]

সুতরাং শরিয়াতের বাইরে কল্যানের কোন ধারণা নেই। বস্তুত সেটা জুলুম ছাড়া আর কিছু নয়।

১)সূরা বাকারা- ১৮৫

২) সূরা মায়েদা- ২৩

৩) সুনানে তিরমিযী- ২৯০৬

Leave A Comment

You must be logged in to post a comment