photo_2020-08-23_01-24-59 (5)

ইসলামে ফিতরাতের ধারণা

মূল: ড. যাহিদ সিদ্দিক মুঘল

অনুবাদ: ইফতেখার সিফাত

ইসলামী ইতিহাসের প্রথম যমানাতে মু’তাযিলাদের মতো যেই কালামী এবং দার্শনিক ভ্রান্তির আত্মপ্রকাশ হয়েছিল, সেটা মুসলিম দুনিয়ায় বৃটিশ উপনিবেশের পর আধুনিকবাদীদের মাধ্যমে পুনরায় প্রাদুর্ভাব হয়েছে। যাদেরকে আমরা নব্য মু’তাযিলা বলতে পারি। উভয় গোষ্ঠির মাঝেই পদ্ধতিগতভাবে এক আশ্চর্যজনক মিল আছে। তবে তাদের আলোচনায় কিছুটা পার্থক্য আছে। নব্য মু’তাযিলাদের মৌলিক ভ্রান্তি হল, তারা শরীয়তকে মাপকাঠি না মেনে অন্যান্য ভ্যালু এবং ধারনাকে বিধান গ্রহণের মাপকাঠি হিসেবে মানতে বেশি আগ্রহী। সেই ভ্যালু কিংবা ধারনাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ‘ফিতরতে ইসলামী’। মানুষের স্বভাবজাত প্রকৃতি।

আমরা অনেককেই বলতে শুনি যে, “ইসলাম মানুষের সহজাত ধর্ম। দ্বীনের প্রতিটি বিষয় মানুষের ফিতরতের মুওয়াফিক বা অনুগামী হয়। অমুক কথা কিংবা কাজ শরীয়ত হতেই পারে না। কারণ তা ফিতরে ইসলামীর সাথে সাংঘর্ষিক। অথচ ইসলাম মানুষের ফিতরী ধর্ম।”

এই কথাগুলোর দুটি অর্থ হতে পারে। একটা হল, ফিতরতে ইসলামী পৃথক কোন মাপকাঠি। যার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারব—কোনটা ইসলামের বিধান আর কোনটা ইসলামের বিধান না। আরেকটা অর্থ হচ্ছে, ইসলাম মানুষের সহজাত ধর্ম হওয়ার মানে হল, ইসলামই মানুষের ফিতরাত। শরীয়তের বিধানগুলোই বলে দিবে কোনটা ফিতরাত আর কোনটা ফিতরাত না। মানুষের ফিতরাতকে ঠিক করে দেয়ার আর কোন মাপকাঠি নেই। দ্বিতীয় মর্মটা  খুব ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে দাঁড় করানো যায়।  কিন্তু উপরোক্ত বক্তব্যের বাহ্যিক অর্থ প্রথমটিই সহজভাবে বুঝা যায়।

আর এটি খুবই মারাত্মক বিষয় এবং দুঃখজনক হলেও সত্য এই অর্থটিই ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয়। যার ফলাফল হল, ইসলামকে মানুষের ফিতরতের অনুগামী হতে হবে। এটি সুস্পষ্ট ভ্রান্তি।  ফিতরতকে পৃথক এবং শরীয়তের বাহিরে কোন মাপকাঠি মেনে নেয়ার পর মূল সমস্যা এবং প্রশ্ন হল, যেই ফিতরতের মাধ্যমে আমরা ওহীকে চ্যালেঞ্জ করছি। সেটার কন্টেন্ট কী এবং তার ইলম আমরা কীসের মাধ্যমে অর্জন করতে পারি? এখন যদি আমরা দাবি করি শরীয়ত ছাড়া অন্য কোন মাধ্যমে আমাদের ফিতরতের জ্ঞান লাভ হয়েছে, তাহলে প্রকারান্তরে আমরা অন্য কোন শিক্ষাকে ওহীর উপর প্রাধান্য দিচ্ছি।

আধুনিক দর্শন শাস্ত্রের প্রতিটি ছাত্রের কাছে এই বিষয়টি স্পষ্ট যে, পুরো মানব সত্ত্বার মাঝে এমন কিছু নেই যার মাধ্যমে ফিতরতে ইসলামীকে জানা যেতে পারে। ওহী ছাড়া মানুষের জ্ঞান লাভের উপাদানগুলোর মাঝে এমন কোন সুনিশ্চিত পদ্ধতি নেই যার মাধ্যমে আমরা মানুষের নফসকে পর্যবেক্ষণ করে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব যে মানুষের ফিতরত কী? এজন্যই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের কাছে মানুষের ফিতরত সেটাই যেটা ইসলাম বলেছে।  ইসলাম যেই বিষয়ের নির্দেশ দিয়েছে সেটাই মানুষের ফিতরতের চাহিদা। যেমন, ইসলাম আমাদের দাড়ি রাখার নির্দেশ দিয়েছে এটাই হল ফিতরাত। এজন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক শিশুই তার ফিতরাত তথা ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করে। [১]

ফিতরতে ইসলাম ভিন্ন কিছু নয় যে যেটাকে ধর্মের বাহিরের বিষয় ভাবতে হবে এবং এর মাধ্যমে বৈধ-অবৈধ ঠিক করতে হবে।

ফিতরতকে জানার জন্য পৃথিবীতে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন মাধ্যম নেই। সুতরাং যদি প্রশ্ন করা হয়, মানুষের ফিতরাত কী? তাহলে উত্তর হবে ইসলাম। আমাদের ভালভাবে বুঝে নিতে হবে যে, দুনিয়াতে কোন প্রাকৃতিক বিধান নেই, যেমনটা সোশ্যাল সাইন্সগুলো দাবি করে। পৃথিবীতে দুই ধরনের বিধান আছে। এক. যা আল্লাহ রচনা করেন। দুই. যা মানুষ রচনা করে।

যেভাবে আল্লাহ তায়ালা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম দিয়ে রেখেছেন, তেমনি তিনি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির এক ফিতরী রূপ শরীয়তের মাধ্যমে প্রদান করেছেন। এই বিধানগুলো এমন নয় যে, অভিজ্ঞতা কিংবা বিবেকের আলোকে গ্রহণ করা হবে। এমন সম্ভাবনাকে মেনে নেওয়া মূলত নবুওয়াতকেই অস্বীকার করা। আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের বাইরে মানব জীবনের জন্য যেসব বিধান স্বয়ং মানুষ তৈরী করেছে, সেটা অবাধ্যতা এবং প্রকৃতি বিরোধি। কখনোই তা ফিতরত নয়। সুতরাং ফিতরতে সালিমাহ (বিশুদ্ধ) সেটাই যেটা ইসলামী বিধান ও চাহিদা মোতাবেক হবে। যেই ব্যক্তি ইসলামী বিধানগুলোকে নিজ ফিতরাত ও মেজাজের পরিপন্থী মনে করবে প্রকৃত পক্ষে সে গাইরে সালীমাহ তথা বিকৃত ফিতরাতে আক্রান্ত। এমন ফিতরতকেই তাযকিয়ার হুকুম দেয়া হয়েছে। যেন সেই ফিতরাত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগামী হয়ে যায়। যেমন রাসূল ইরশাদ করেছেন, “তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমাদের নফস আমার আনীত শরীয়তের অনুগামী না হবে।” [২]

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,”সেটাই আল্লাহর ফিতরত কিংবা প্রকৃতি যার উপর তিনি মানুষেকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই প্রতিষ্ঠিত দ্বীন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।” [৩]

১) সহীহ বুখারী- ১৩৫৮

২) আল আরবাঊনা লিন নববী

৩) সূরা রূম- ৩০

Leave A Comment

You must be logged in to post a comment