photo_2020-09-13_22-48-10

ইসলামি ইতিহাস পাঠের পূর্ব সতর্কতা

ইফতেখার সিফাত

নিরপেক্ষতা এমনই একটি শব্দ, অবস্থান হিসেবে যার কোন বাস্তবতা নেই। নিরপেক্ষতা (no position) বলতে পৃথিবীতে মূলত কোন কিছুর অস্তিত্বই নেই। প্রত্যেকেই যেকোন একটা মাপকাঠির আলোকে সিদ্ধান্ত প্রদান করে থাকে। কোন একটা মূলনীতির জায়গা থেকে সব কিছু বিচার করে। সুতরাং মানদণ্ডের প্রশ্নে কেউ নিরপেক্ষ হতেই পারে না। ড. ইয়াদ আল কুনাইবি হাফিযাহুল্লাহ বলেন, নিরপেক্ষতা সম্পূর্ণ অকার্যকর একটি ধারণা।

প্রাসঙ্গিকভাবে বলে রাখি, সেকুলার রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ ভাবাও একটি চরম ভুল। কারণ সেকুলারিজমের নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো আছে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে তার আলাদা ধারণা আছে। সেই মূলনীতির জায়গা সে মানুষকে শাসন করে। সুতরাং মাপকাঠির জায়গা থেকে সেকুলারিজম আলাদা একটি ধর্ম। ফলে সেকুলারিজম সাধারণভাবে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করে না। বরং সেই জায়গায় আরেকটি ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করে। আবার সে সব ধর্ম ও মতের প্রতি সহিষ্ণু ও নিরপেক্ষ থাকে না। সে সবার উপর নিজস্ব বিশ্বাস চাপিয়ে দেয়। তার চাপিয়ে দেয়া বিশ্বাস কেউ প্রত্যাখ্যান করলে তাকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে। এমনকি তার বেঁচে থাকার অধিকারকেও অস্বীকার করে।

মোটকথা, নিরপেক্ষতার দাবি আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছুই না। বলতে গেলে এটা এক প্রকার বুদ্ধিবৃত্তিক বাটপারি। যারা নিজেদের নিরপেক্ষ দাবি করে তারা সমস্ত মূলনীতি থেকে বেরিয়ে শূন্যে অবস্থান করে না এবং এটা সম্ভবও না। দুনিয়ায় এমন কোন অবস্থান নেই যা নিরপেক্ষ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কেউ বলল “আমি এই বিষয়ে মুসলিম হিসেবে নয়, নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে চিন্তা করব” এমন বক্তব্য চূড়ান্ত পর্যায়ের নির্বুদ্ধিতা ছাড়া কিছুই না। ইসলামের অবস্থান থেকে সরে মানুষ কিসের অবস্থান গ্রহণ করবে? ইসলামের বাইরে তো কুফুরিই একমাত্র অবস্থান। এর মাঝে তৃতীয় কোন অবস্থান নেই। আর কুফুর তো নিরপেক্ষ না। এটাও তো একটা পাক্ষিক অবস্থান। ঈমান ও কুফুরের মাঝামাঝি কোন অবস্থান নেই।[১]

ইসলামি শরীয়াতেও নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই। মহান আল্লাহ তা’য়ালা মুমিনদের নিরপেক্ষ থাকার নির্দেশ দেননি। তাদেরকে সব জায়গায় নির্দিষ্ট একটি অবস্থান গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর সেটা হল হক ও আদলের অবস্থান।[২]

এবার নিরপেক্ষতার ব্যাপারটা ইতিহাস পাঠের ক্ষেত্রে চিন্তা করা যাক। ইতিহাস পাঠের ক্ষেত্রেও মূলনীতির জায়গা থেকে কেউ নিরপেক্ষ নয়। ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে ইসলামি ইতিহাস পাঠের পৃথক সুবিন্যস্ত মূলনীতি আছে। আছে ইতিহাসকে বিশ্লেষণ ও তার শুদ্ধতা যাচাইয়ের স্বতন্ত্র সমৃদ্ধ পদ্ধতি। ইলমুর রিজাল, ইলমুল জারাহ ওয়াত তা’দীল[৩] এর মত স্বতন্ত্র শাস্ত্রই গড়ে উঠেছে ইসলামি রিওয়ায়েতের শুদ্ধতা যাচাই পদ্ধতির অংশ হিসেবে। আর এই শাস্ত্রগুলো ইসলামের প্রতিটি জ্ঞান শাখার সাথে প্রাসঙ্গিক। বস্তুত ইসলামের মত সুবিন্যস্ত নিপুণ ও সমৃদ্ধশালী ইতিহাস পাঠের নীতি আর কোন মতবাদ কিংবা ব্যক্তির নেই।

ঠিক এমনিভাবে প্রাচ্যবিদদেরও ইসলামি ইতিহাস চর্চার আলাদা নীতি ও উদ্দেশ্য আছে। অধিকাংশ তো ইসলামকে বিকৃত করা,  মানুষের কাছে ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, মুসলিমদের ভিতর ইসলামের ব্যাপারে সন্দেহ তৈরি করা,  পাশ্চাত্যের সাথে ইসলামকে সামঞ্জস্যশীল করাসহ আরো অসংখ্য বিকৃত এজেন্ডা সামনে নিয়ে ইসলামকে পড়েছে। মুসলিমদেরকে পাশ্চাত্যের ধর্মে দীক্ষিত করা, মুসলমানদের উপর তাদের উপনিবেশ ও আদর্শিক কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখা এবং পাশ্চাত্য ও ইসলামি সভ্যতার মাঝে সংঘাতময় জায়গাগুলো মিটিয়ে দেয়া ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। আবার কেউ কেউ নিরপেক্ষতার জায়গা থেকেও ইসলামি জ্ঞানকে চর্চা করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা পাশ্চাত্য কিছু মূল্যবোধে বিশ্বাসী হওয়ায় সেই জায়গা থেকে ইসলামকে দেখেছে। হাসান আসকারি রহিঃ বলেন, প্রাচ্যবিদদের ইসলামি জ্ঞান চর্চার নেপথ্যে ষড়যন্ত্রমূলক বিভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল। তবে এই উদ্দেশ্যসমূহের পাশাপাশি সেসব চিন্তাচেতনার প্রভাব কার্যকর ছিল যেগুলো পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসে নানাভাবে জন্ম নিয়েছিল। যেমন ইতিহাসবাদ, মুক্তচিন্তা, বস্তুবাদ ইত্যাদি। ফলে ষড়যন্ত্রমূলক উদ্দেশ্যের বাইরে থেকেও যারা নিষ্ঠার সাথে ইসলামি জ্ঞান চর্চার প্রতি মনোনিবেশ করেছিল উল্লেখিত পাশ্চাত্য দর্শনগুলোর প্রভাবে তাদের মস্তিষ্কটাই বিকৃত হয়ে পড়েছিল। যেই মস্তিষ্ক সত্য বুঝার ক্ষমতা রাখে না। ইসলামি জ্ঞান শাস্ত্র চর্চার ক্ষেত্রে প্রাচ্যবিদদের সমচেয়ে বড় মৌলিক ত্রুটিই ছিল এই জায়গাটায়।[৪]

প্রাচ্যবাদ গবেষক এডওয়ার্ড সাঈদ বলেন, “আধুনিক ইসলাম বিষয়ে – কিংবা বলা যায় আঠারো শতক থেকে পরবর্তী সময়ের ইসলামি বিশ্বের সমাজ, জনগোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে  – বিশেষজ্ঞগণ এমন এক স্থিরীকৃত পরি-কাঠামোর সীমানার ভেতরে কাজ করেছেন , যা ইসলামি বিশ্বের দ্বারা নির্ধারিত হয় নি। অস্বীকার করার উপায় নেই যে , অক্সফোর্ড বা বোস্টনে বসে যিনি গবেষণা করছেন বা লিখছেন , তিনি তার গুরুর দ্বারা চিহ্নিত মানদণ্ড, প্রথা-রীতি ও আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ীই গবেষণা করছেন। যেই মুসলিমদের নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, সেই মুসলমানরা এসব গবেষণায় কোন প্রভাব ফেলতে পারে না।”[৫]

অর্থাৎ ইসলাম নিয়ে অমুসলিমদের গবেষণা তাদের নিজস্ব মানদণ্ডেই সম্পাদিত হয়। সেই গবেষণাতে ইসলামী জ্ঞানশাস্ত্রের নিজস্ব পাঠপদ্ধতির কোন তোয়াক্কা করা হয় না। মুসলিমদের গবেষণাকে তারা সোর্স হিসেবে গ্রহণ করে না। আর কোন ক্ষেত্রে করলে ততটুকুই গ্রহণ করে যতটুকু তাদের নিজস্ব এজেন্ডা কিংবা মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যতা রাখে।

শাইখ মোস্তফা আস সিবায়ি হাফিযাহুল্লাহ প্রাচ্যবিদদের ইসলাম চর্চার মৌলিক কারণগুলো তার ‘আল ইস্তিশরাক ওয়াল মুস্তাশরিকুন মা লাহুম ওয়ামা আলাইহিম‘ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। প্রাচ্যবিদরা রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক, ধর্মীয়, ঔপনিবেশিকসহ বিভিন্ন ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনার জায়গা থেকে ইসলামকে নিয়ে গবেষণামূলক অধ্যয়ন চালিয়েছে। তাদের মধ্যে খুব নগণ্য সংখ্যক প্রাচ্যবিদ এমন ছিল যারা নিছক জ্ঞানগত উদ্দেশ্যেই ইসলামি জ্ঞান শাস্ত্রকে পাঠ করেছে। তবে উদ্দেশ্য ষড়যন্ত্রমূলক না হলেও অনুসন্ধান ও পর্যালোচনার ক্ষেত্রে তারা ভুলভ্রান্তি এবং সত্য থেকে দূরবর্তী উপসংহার গ্রহণ করা থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। মৌলিকভাবে এর দুটি কারণ হতে পারে। এক. আরবী ভাষার বিভিন্ন ব্যবহারিক নীতি ও মর্মগত পদ্ধতির ব্যাপারে অজ্ঞতা।

দুই. প্রকৃত অর্থে ইসলামের ঐতিহাসিক পরিবেশ ও মূল্যবোধ সম্পর্কে অজ্ঞতা। ফলে তারা ইসলামকে সেভাবেই চিন্তা করে যেরকম নিজ সমাজকে দেখছে। তাদের সমাজের সাথে ইসলামের সহজাত মূল্যবোধ,  আধ্যাত্মিক এবং পরিবেশগত বৈষম্যকে তারা আমলে নেয়নি। অথচ এই বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিষয়গুলো যেই ইতিহাস তারা চর্চা করছে এবং যেই পরিবেশে তারা বসবাস করছে, দুটোর মাঝে পার্থক্যের এক সীমারেখা টেনে দেয়।[৬]

আরো সহজভাবে বলল, তারা কিছু বিশ্বাসকে প্রশ্নের উর্ধ্বে মনে করে নিয়েছে। ফলে তারা ইসলামি ইতিহাসেও সেই বিশ্বাসগুলোর সংশ্লিষ্টতা খুঁজেছে। আর ইসলামের কিছু বিষয়ের সাথে বাহ্যিক মিল দেখে তারা সেগুলো ইসলামি হিসেবে দেখিয়েছে। শাইখ আলি মিয়া নাদভি রহঃ বলেন, প্রাচ্যবিদদের ইসলাম চর্চার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত একটি ভ্রান্তি হল, আগ থেকেই একটা উদ্দেশ্য ও ফলাফল ঠিক করে নেয়া। এরপর এই ফলাফলে পৌঁছার জন্য এবং এটাকে প্রমাণ করার জন্য অপ্রাসঙ্গিক বিভিন্ন তথ্য জমা করা। (অথচ শুদ্ধতা ও সনদের বিচারে সেসব তথ্যের অধিকাংশই দুর্বল। একাডেমিকভাবে যেগুলোর কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই।) ফলে এই পদ্ধতিতে এমন কোন দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি নির্মাণ করে যেটার সম্পর্ক কেবল তাদের প্রবৃত্তির সাথে। ইসলামি সমাজের সাথে যার নুন্যতম সম্পর্ক নেই।[৭]

 এই ক্ষেত্রে আরো বড় একটি সংকট হল পরিভাষা সংক্রান্ত। প্রথমত ইসলামি পরিভাষাগুলো তারা ভালোভাবে আয়ত্ত করতে পারেনি। আবার পরিভাষা সম্পর্কে কিছু জানাশোনা থাকলেও ইসলামকে চর্চার ক্ষেত্রে পরিভাষাগুলোকে গুরুত্ব দেয়নি। উদাহরণস্বরূপ বলি, আরবীতে أسلم শব্দের শাব্দিক অর্থ হল আত্মসমর্পণ করা। কিন্তু এর পারিভাষিকভাবে শব্দটা ইসলাম গ্রহণ করাকে বোঝায়। এখন কেউ চাইলেই এই শব্দটাকে শাব্দিক অর্থে ব্যবহার করে একটা ভুল চিত্র উপস্থাপন করতে পারে। যেমনটা কিছু কিছু প্রাচ্যবিদের ক্ষেত্রে ঘটেছে। তারা ইসলামী ইতিহাসে কোন গোত্রের ইসলাম গ্রহণের ঘটনাতে আত্মসমর্পণ অর্থ তুলে এমন চিত্র দেখানোর চেষ্টা করেছে যে, তাদেরকে জোরপূর্বক ইসলামে দীক্ষিত করা হয়েছে। এটা কেবল একটা উদাহরণ। প্রাচ্যবিদদের লেখায় পরিভাষা সংক্রান্ত এমন জটিলতার ভরপুর উপস্থিতি পাবেন। যেখানে হয়ত তারা ইসলামের পরিভাষাকে তাদের বিশ্বাসের জায়গা থেকে ব্যবহার করেছে কিংবা তাদের ধর্মের পরিভাষাকে ইসলামের উপর প্রয়োগ করে দিয়েছে।

এজন্য ইসলামি ইতিহাস যাচাই ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আকিদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।[৮] কারো চিন্তা-চেতনা নষ্ট এবং সে ইসলাম থেকে মুক্তও হতে চাচ্ছে না কিংবা সে ইসলামকে একটি ধর্ম হিসেবে মন্দও মনে করে না। এমন ব্যক্তি ইসলামি ইতিহাসকে নিজ চিন্তাচেতনার আলোকে বিশ্লেষণ করবে এবং বর্ণনা করবে। ইসলামি ইতিহাসে সে নিজ চিন্তার উপস্থিতি দেখানোর চেষ্টা করবে। আর নিশ্চিতভাবেই অমুসলিম লেখকদের অবস্থা এরকমই। কারণ ইসলামকে বিশ্লেষণ ও যাচাই করার জন্য যেই মানদণ্ড ও আক্বীদা থাকা প্রয়োজন সেটা তাদের নেই।

যেমন ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি আকিদা হল, সাহাবাদের কেউ আল্লাহর রাসূলের নামে মিথ্যা বলতে পারে না। এজন্য ইসলামী একাডেমিতে কোন হাদিসের সূত্র সাহাবা পর্যন্ত পোঁছে গেলে সেই সাহাবার আদালত বা ন্যায় হওয়ার ব্যাপারে আলাদা করে খোঁজ নেয়া হয় না। তারা বিনাবাক্যেই দ্বীনের ব্যাপারে সৎ। আদালতের তালাশ সাহাবাদের নিচ থেকে সনদে থাকা ব্যক্তিদের থেকে শুরু হয়। কারণ তারা হলেন এই উম্মতের সবচেয়ে আমানতদার শ্রেণি।[৯]

ইবনে তাইমিয়া রহঃ বলেন, সাহাবাদের মাঝে এমন কেউ নেই যিনি রাসূলের ব্যাপারে মিথ্যা বলেছেন।[৯] সাহাবাদের দ্বীনি মর্যাদার ব্যাপারে এরকম অসংখ্য দলিল দেয়া যাবে। এই আলোচনার সেসব দলিল আনার সুযোগ নেই। এখানে দৃষ্টান্তস্বরূপ মৌলিক একটি আকিদা আনা হয়েছে।

এখন কোন প্রাচ্যবিদ কোন এক সাহাবার ব্যাপারে জাল হাদিস বর্ণনার অভিযোগ করল। ইসলামি আকিদা অনুযায়ীই তার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যাত।

প্রাচ্যবিদরা অনেক আগ থেকেই আবু হুরাইরা রাঃ এর ব্যাপারে হাদিস জাল করার অভিযোগ করে আসছে। আল্লামা মোস্তফা আস সিবায়ি রহঃ স্বীয় গ্রন্থে এই মিথ্যাচারের জবাব দিয়েছেন।[১০]

তাছাড়া প্রাচ্যবিদদের কাছে ইসলামের মত সনদ ও রিজাল যাচাইয়ের কোন পারফেক্ট পদ্ধতি নেই। ইসলামি ইতিহাস শাস্ত্রে সনদের ধারাবাহিকতা, সেই ধারাবাহিকতায় থাকা ব্যক্তিদের নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত মূলনীতি আছে। অমুসলিমদের কাছে এটা নেই। ফলে তাদের ঐতিহাসিক বর্ণনায় শুদ্ধ-অশুদ্ধ, সত্য-মিথ্যা স্বাভাবিকভাবেই মিশ্রণ হয়ে যায়। তারপর যদি থাকে ষড়যন্ত্রমূলক উদ্দেশ্য তাহলে তো ব্যাপারটা আরো ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়। আলি মিয়া নাদভি রহঃ বলেন, প্রাচ্যবিদরা ইসলামের অনেকগুলো বিষয়কে ভালভাবে উপস্থাপন করে। এর মাঝে সুকৌশলে এক দুইটা ভুল ও খারাপ উপস্থাপনা মিশিয়ে দেয়। যেন পাঠক তাকে নিরপেক্ষ এবং প্রশস্ত দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ভেবে নিয়ে মুগ্ধ হয় এবং তার দেয়া তথ্যগুলোকে সঠিক ও স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে নেয়।[১১] [১২]

প্রাচ্যবিদদের ইতিহাস পাঠের অন্যতম একটি নীতি হল ইতিহাসবাদ (historicalism)। এই পদ্ধতির মূল কথা হল, ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূলনীতির ভিত্তিতে কোন কিছুর শুদ্ধাশুদ্ধির হুকুম প্রয়োগ করা যাবে না। বরং ইতিহাসে দেখতে হবে সেটার ধরণ প্রভাব ও অবস্থান কী ছিল। সেই আলোকে বিষয়টিকে বিচার করা হবে।

এই পদ্ধতি অনেক মুসলিমকেই বিভ্রান্ত করেছে। অনেক মুসলিম চিন্তাবিদদের উপর ইতিহাসবাদের প্রভাব রয়েছে। হাসান আসকারি রহঃ বলেন, মানুষকে ধর্মীয় বিধান থেকে বিমুখ করার ক্ষেত্রে ইতিহাসবাদের ভাল প্রভাব আছে। ইসলামের বিরুদ্ধে প্রাচ্যবিদদের যত প্রোপাগান্ডা এবং ষড়যন্ত্র সফলতার মুখ দেখেছে এর পিছনে ইতিহাসবাদের ভূমিকা সবচেয়ে ব্যাপক।[১২]

ইতিহাসকে শরিয়তের দলিল বানানো মৌলিকভাবে আল্লাহর তাকওয়িনি কিংবা তাকদিরি বিষয়কে দেখিয়ে আল্লাহর তাশরিয়ি বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করার নামান্তর।

মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষ সৃষ্টি থেকে শুরু করে বিশ্বপরিচালনার জন্য যেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া চলমান রেখেছেন এবং জগতে যা কিছু ঘটে সেটাই আল্লাহর কদরের অন্তর্ভুক্ত। এটাকে আমরে তাকওয়িনি বলে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে তিনি যেই জীবন বিধান দান করেছেন এটা হল আল্লাহর আমরে তাশরিয়ি। মানুষের কর্মের বিচার আল্লাহর আমরে তাশয়িরি তথা ইসলামি শরিয়ার আলোকে হয়। আমরে তাকওয়িনি তথা কদর দিয়ে মানুষের কর্মে বিচার করা যায় না।

কদরকে দেখিয়ে শরিয়াহ প্রত্যাখান করা অনেক পুরাতন ভ্রান্তি। এই ভ্রান্তির ডালপালা অনেক বিস্তৃত। মক্কার মুশরিকরাও তাদের শিরকি কর্মকাণ্ডের পক্ষে কদরকে দলিল বানাতো।  পবিত্র কুরআনে এই সংক্রান্ত বেশ কিছু আয়াত রয়েছে। যেমন মুশরিকরা বলত, “যদি আল্লাহ চাইতেন তাহলে আমরা শিরক করতাম না, ফেরেশতাদের পূজা করতাম না, তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করতাম না।”[১৩]

আয়াতগুলোর তাফসিরে মুফাসসিরে কেরাম তাকওয়িনি এবং তাশরিয়ি বিষয়ের পার্থক্য নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। যার সারমর্ম হল, আল্লাহর তাকদিরি বিষয় কখনো বান্দার কর্মের পক্ষে দলিল হতে পারে না এবং এর মাধ্যমে কখনো শরিয়তের বিধান ও প্রত্যাশায় কোন প্রকার বিকৃতি ও শিথিলতা আনা যাবে না।[১৪]

এই ভ্রান্তি নিয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। আমাদের আলোচনার বিষয় হল ইতিহাস। আর ইতিহাস আল্লাহর কদরেরই অন্তর্ভুক্ত। ইতিহাস পাঠের মাধ্যমে আমরা সৃষ্টিজগতে আল্লাহর কদর সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারি। ইতিহাস আমাদের কাছে কিছু তথ্য সরবরাহ করে। যার মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন ঘটনাবলীর বিবরণ জানতে পারি। সেখানে ভাল-মন্দ সব কিছুরই অস্তিত্ব আছে। ইতিহাস ভাল-মন্দের আয়না, তবে ভাল-মন্দের উৎস না। ভাল-মন্দের উৎস কুরআন এবং সুন্নাহ। ইসলামি একাডেমিতে ইতিহাস দিয়ে শরিয়াহকে বিচার করা যায় না। বরং শরিয়ার মাধ্যমে ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করতে হয়, তারপর শরিয়া ও আকিদার মাপকাঠিতেই শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়।

এজন্য ইসলামি জ্ঞান শাস্ত্রে বিধান বর্ণনার জন্য কেবল ইতিহাসের ভাষায় কথা বলার কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই। এটা ইলমি খিয়ানত। বিধানের ক্ষেত্রে কথা বলতে হয় ফিকহের ভাষায়। ইতিহাসকে আনা হয় কেবল সেই বিধান বাস্তবায়নের কিছু দৃষ্টান্ত স্বরূপ, উৎস হিসেবে নয়। যদি ইতিহাসকে বৈধ অবৈধতার উৎস মানা হয়, তাহলে জগতে বৈধ অবৈধের নির্দিষ্ট কোন ধারণা পাওয়া যাবে না। কারণ সেখানে ভাল-মন্দ সবকিছুরই সমাহার আছে।

সবশেষে বলব, ইসলামি ইতিহাসকে বিশুদ্ধভাবে চর্চা করতে হলে ইসলামি নীতিমালার আলোকেই তা সম্পাদন করতে হবে। কেউ যদি সাধারণভাবে ইসলামের প্রকৃত ইতিহাস পড়তে চায়; বিধানগতভাবে তার উপর আবশ্যক হল, সেসব মুসলিম ইতিহাসবিদদের বইপত্র অধ্যয়ন করা যারা ইসলামী ইতিহাস পাঠের নীতিমালার আলোকে ইতিহাসকে চর্চা করেছেন। কোন অমুসলিম লেখক থেকে ইসলামি ইতিহাসের সবক নেয়া তার জন্য বৈধ হবে না। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,”হে মু’মিনগণ! কোন পাপাচারী যদি তোমাদের কাছে কোন খবর নিয়ে আসে, তাহলে তার সত্যতা যাচাই করে নাও, তা না হলে তোমরা অজ্ঞতাবশতঃ কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে বসবে, অতঃপর তোমরা যা করেছ সেজন্য তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হবে।”[১৫]

ইতিহাস অধ্যয়নের ক্ষেত্রে অমুসলিম লেখকদের বইপত্রের উপর নির্ভরশীল ব্যক্তির ভ্রান্তি নিশ্চিত। এই বাস্তবতার পক্ষে অনেক দৃষ্টান্ত আছে। এজন্য মুসলিম স্কলারগণ প্রাচ্যবিদদের থেকে বিরত থাকতে একটি আয়াত ব্যবহার করেছেন। “হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আহলে কিতাবদের কোন ফেরকার কথা মান, তাহলে ঈমান আনার পর তারা তোমাদেরকে আবার কাফের বানিয়ে ছাড়বে।”[১৬]

ইসলামি ইতিহাস পাঠের নীতিমালা উৎসের দিক থেকেও শক্তিশালী। এই নীতিমালা সংগ্রহ করা হয়েছে আল্লাহর দেয়া শরিয়ত থেকে। আর এর বাইরের সব নীতিমালা আদতে কুপ্রবৃত্তি নির্ভর। কারণ আল্লাহপ্রদত্ত নীতিমালার বাইরে প্রকৃতপক্ষে মানুষ খাহেশাতেরই অনুসারী হয়। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলছেন,” অতঃপর তারা যদি আপনার কথায় সাড়া না দেয়, তবে জানবেন, তারা শুধু নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। আল্লাহর হেদায়েতের পরিবর্তে যে ব্যক্তি নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তার চাইতে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে? নিশ্চয় আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে পথ দেখান না।”[১৭] [১৮][১৯]

পাদটীকা:

১] মাক্বালাতে তাফহিমে মাগরিব , পৃঃ ১০৬

২] সূরা মায়েদা, আয়াতঃ ৪৩,৪৮

৩] ইলমুল জরাহ-তা’দিল বলা হয় বর্ণনাকারীদের বিষয়ে বর্ণিত ভালোমন্দ মন্তব্যসমূহ জানার শাস্ত্রকে।

৪] জাদিদিয়্যাত, পৃঃ ৭২

৫] কাভারিং ইসলাম, পৃঃ ১৬৫

৬] আল ইস্তিশরাক ওয়াল মুস্তাশরিকুন, শাইখ মোস্তফা আস সিবায়ি, পৃঃ ৩২

৭]  আল ইস্তিশরাক ওয়াল মুস্তাশরিকুন, শাইখ আবুল হাসান আলি নাদভি, পৃঃ ১৮

৮] ড. আকরাম জিয়া উমরি বলেন, “মহাবিশ্ব, জীবন ও মানুষ সম্পর্কে ইসলামের যে ব্যখ্যা তা দাঁড়িয়ে আছে আল্লাহ তায়ালা, তার কিতাবসমূহ, রাসুলগণ, পরকাল ও তাকদিরের বিশ্বাসের উপর। এটি মোটেও ইসলামের আকিদার বাইরের কিছু নয়। ইসলামি ইতিহাস বিশ্লেষণ মোটেও বস্তুবাদী কোনো বিশ্লেষণ নয়, যেখানে  উৎপাদনের উপকরণ মানব ইতিহাসের গতিপ্রকৃতির একমাত্র  প্রভাবক ও নিয়ন্ত্রনের চালিকাশক্তি হয়ে উঠে, যেমনটা মার্ক্সবাদী ইতিহাসের গবেষকরা মনে করে থাকেন। ভৌত পরিবেশ, জলবায়ু, ভূপ্রকৃতি, অর্থনীতি ইত্যাদির মতো বাহ্য উপাদানের প্রভাবের ফলে ইতিহাসের গতি পরিবর্তনের ব্যাখ্যাও ইসলামি ইতিহাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এসবই পশ্চিমা বস্তুবাদী ব্যাখ্যা। ইসলামি ব্যাখ্যায় বর্ণিত হয়, আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত বিধি-বিধানের সীমারেখায় মানুষের দায়িত্ব  এবং সামাজিক ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনে তার কার্যকর ভূমিকার কথা।”

(আল মুজতামাউল মাদানি ফি আহদিন নবুওয়াহ,১৬ – ডক্টর আকরাম জিয়া উমরি)   

৯] সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বরঃ ১৯৬১

১০] আর রদ্দু আলাল ইখনাই, পৃঃ ১০৩

১১] আল ইস্তিশরাক ওয়াল মুসতাশরিকুন, আলি মিয়া নাদভি, পৃঃ ১৮

১২] বাংলাদেশে বাম ঘরনার একজন ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করে। তার নাম পারভেজ আলম। ইসলাম নিয়ে তার পড়াশোনার সমস্ত উৎস হল প্রাচ্যবিদদের লেখা বইপত্র। সেই হিসেবে মতাদর্শ গত জায়গা থেকে তাকেও একজন প্রাচ্যবিদ বলা যায়। সে ইতিমধ্যে ইসলাম নিয়ে বেশ কয়েকটি বই লিখেছে। তার বইগুলোর প্রতিটি পাতাই প্রাচ্যবিদদের বিষে ভরপুর। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের কিছু বুদ্ধিজীবী মানুষ তার গুণগ্রাহী পাঠক। তার লেখা বইপত্রের রেফারেন্স দিয়ে তারা ইসলামের ভুল শুধরাতে মরিয়ানা। সদ্য থেমে যাওয়া ম্যাগাজিন (আমার এই প্রবন্ধটি উক্ত ম্যাগাজিনের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল)। চিন্তাযানের সর্বশেষ সংখ্যায়ও পারভেজ আলমের একটি বইয়ের রিভিউ এসেছে। রিভিউ লেখক খুব যত্নের সাথে তার বইকে উৎযাপন করেছেন। কিন্তু ইসলামের উপর তথ্যগত অপবাদগুলো সয়ে গেছেন।

১২] আল ইস্তিশরাক ওয়াল মুসতাশরিকুন, আলি মিয়া নদভি, পৃঃ ১৮

১৩] জাদিদিয়্যাত, পৃঃ ৬৩

১৪] সূরা আন’আম, আয়াতঃ ১৪৮, সূরা যুখরুফ, আয়াতঃ ২০

১৫] ইবনে কাসির, খন্ডঃ ৪, পৃঃ ৫৭০। আত- তাহরির ওয়াত তানওয়ির, খন্ডঃ ৭, পৃঃ ২০৬

১৬] সূরা হুজুরাত, আয়াতঃ ৬

১৭] সূরা আলে ইমরান, আয়াতঃ ১০০

১৮] সূরা কাসাস, আয়াতঃ ৫০

১৯] এই সতর্কতা কেবল ইসলামী ইতিহাস পাঠের ক্ষেত্রেই নয়, পুরো ইসলামী জ্ঞানশাস্ত্রের ব্যাপারেই প্রযোজ্য। ইসলামের প্রতিটি জ্ঞানশাখা চর্চার জন্য স্বতন্ত্র মূলনীতি আছে। আর যেকোন জ্ঞানশাস্ত্রকেই তার নিজস্ব মূলনীতির আলোকেই পাঠ করতে হয়। নতুবা সেই জ্ঞানশাস্ত্রের ব্যাপারে বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন সম্ভব না।

Leave A Comment

You must be logged in to post a comment