photo_2020-10-31_17-40-11

আধুনিক মুসলিম নারী সমাজের স্বরূপ সন্ধানে

সাদিয়া তামান্না

বর্তমান যুগের মুসলিম বোনেদের বিরাট অংশ কোনো না কোনোভাবেই পোস্টমর্ডার্ন চিন্তাভাবনা দ্বারা প্রভাবিত। এমনকি যারা অন্যদেরকে কলোনিয়ালাইজড বলে, তাদের অনেকে নিজেরাই কলোনিয়ালাইজড। আর যারা কলোনিয়ালাইজড না তাদের অনেকেই উপমহাদেশীয় ব্রাহ্মণ্যবাদ দ্বারা চরমভাবে প্রভাবিত। কেউ কেউ নিজ নিজ দেশীয় টক্সিক পুরুষতন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত। আমি যেহেতু উপমহাদেশের মেয়ে, তাই প্রথম দুই দলের ব্যাপারে আমার আলাপ কিছুটা সার্বজনীন হলেও তৃতীয় ভাগে আমি বিশেষভাবে বাঙালি মুসলিম সমাজে মেয়েদের মধ্যে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রভাব প্রসঙ্গে আলোচনা করবো। আমাদের আলাপ বিশেষত বর্তমান প্রজন্মকে নিয়ে। আমাদের এক প্রজন্ম আগে বা দুপ্রজন্ম আগের মুসলিম নারীদের নিয়ে আলাপ করাটা এ আলোচনায় খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়।
মুসলিমদের মধ্যে একদল মুসলিম কেবল নামেই মুসলিম। তাদের ব্যক্তিগত জীবনে কর্মগত বা আদর্শগত কোনো দিক থেকেই ইসলামের ছিটেফোঁটা নেই। তাদের বাইরে বাদবাকি মুসলিম নারীদের নিয়ে এ লেখাটিতে আলাপ করা হবে। এ লেখাটি অমুসলিম পাঠকদের জন্য নয়। তাই ইসলামের নির্দিষ্ট কোনো আদর্শিক অবস্থানের পিছনে কী হিকমাহ আছে সেসব বিষয়ে আলাপ করে আমি আমাদের আলোচনা বৃদ্ধি করব না। অমুসলিমদের প্রশ্ন ও এর উত্তর নিয়ে আমরা অন্য কোনো লেখাতে আলাপ করব ইন শা আল্লাহ। এ লেখাটি কেবল তাদের জন্য, যারা দাবী করে, ইসলামী শরীয়াহর দলীলকে তারা কোনো “যদি এবং কিন্তু” ছাড়া মেনে নেয়। তাই আমরা এখানে কেবল শরঈ দলীলের আলোকে কথা বলার চেষ্টা করব ইন শা আল্লাহ। কেননা আমাদের আলাপে এমন অনেক ভাই-বোনই রয়েছে যারা দলীল গ্রহণের কথা বললেও জেনে বা না জেনে দলীলের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে।
এ লেখাটা যারা পড়বেন, অর্ধেক পড়েই কোনো মন্তব্য না করে পুরোটা পড়ার বিনম্র অনুরোধ রইলো। আমি মূলত মুসলিম বোনেদেরকে মোটাদাগে চার ভাগে বিভক্ত করে থাকি। বলা বাহুল্য, এ শ্রেণীবিভাগটা আক্বিদাগত শ্রেণী বিভাজন,আমলি না। কেননা আমলের দিক থেকে শ্রেণীবিভাজনের করার চেয়েও আদর্শিক শ্রেণীবিভাজনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আদর্শিক ভিত্তিই আমাদের আমলকে চালিত করে। এমন অনেক বিধান আছে যা ফিক্বহী হলেও তা মানা বা অস্বীকার করাটা আদর্শের সাথে সম্পর্কযুক্ত। সাধারণত আদর্শের কারণে মুসলিমরা যতবেশি ইসলাম থেকে বিচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, আমলের কারণে তূলনামূলক ততবেশি সম্ভাবনা থাকে না। তাই আদর্শিক দিক থেকে মুসলিম নারীদের আমি চার শ্রেণীতে বিভক্ত করেছি। যথাঃ
১। মডার্নিস্ট;
২। মডারেট;
৩। ব্রাহ্মণ্যবাদে প্রভাবিত সাধারণ মুসলিম নারী;
৪। আদর্শগতদিক থেকে মধ্যমপন্থী মুসলিম নারী।

১। মডার্নিষ্ট :
এই শ্রেণীর মুসলিম নারীরা মূলত হার্ডকোর ফেমিনিস্ট। তারা নিজেদের জন্য এ তক্বমা ব্যবহার করুক বা না করুক, জেনে বা না জেনে তারা কট্টর নারীবাদী। হয়তো নিজেদের অজান্তেই তারা ইসলামোফোব। ইসলামোফোব বলাতে অনেকেই হয়তো অবাক হচ্ছেন। বাস্তবতা তো এটাই যে, ইসলামের কোনো বিধানকে তুচ্ছ করা বা কোনো বিধানের প্রতি বিদ্বেষ রাখা ইসলামোফোবিয়ার একটা অংশ। এরা কারা তা নিয়ে আমি প্রায়শ বলি। এটা জরুরী নয় যে, তাঁদের ব্যাপারে এখানে যেসব বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হচ্ছে, জরুরী না যে, প্রত্যেকটা বৈশিষ্ট্যই প্রত্যেকের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ বৈশিষ্ট্যই ইসলামের সাথে মোটাদাগে সাংঘর্ষিক। আর একাধিক সাংঘর্ষিক বৈশিষ্ট্য তাঁদের অবস্থানকে এতটা প্রশ্নবিদ্ধ করে যে, এসবের কোনো তাওয়িল(ব্যাখ্যা) হয় না। তাদের অনেকেই হিজাবকে একইসাথে আল্লাহর বিধান ও মুসলিম নারীদের চয়েজ হিসেবে উপস্থাপন করে। নারীবাদ বা লিবারেল মাপকাঠি দিয়ে নারীবাদী কিংবা লিবারেলদের হিজাবফোবিয়ার বিরুদ্ধে বলার সময় “পোশাক যদি নারীর চয়েজ হয় তবে হিজাব কেন চয়েজ হতে পারে না?”-প্রশ্ন তোলা এক বিষয়, আর হিজাবের বিধানকে চয়েজ হিসেবে উপস্থাপন করা আরেক বিষয়। এছাড়াও তাদের অনেকে পুরো দুনিয়াকে নারীদের ঘর বলে দাবী করে। একজন সচেতন মুসলিমের কাছে এ দাবী হাস্যকর শুনালেও এব্যাপারে কথা বলাটা জরুরী। কেন জরুরী? কারণ এসব দাবী যারা করে তারা হিজাব পরিধান করে এবং ইসলাম নিয়ে কথা বলে। পাশাপাশি তাদের কথার ধাঁচ আমাদের কলোনাইজড মেন্টালিটির কমন সেন্সে ঠিকঠাক মনে হয়। ফলে পুরোদস্তুর মডার্নিস্ট এ শ্রেণীর বোনেরা অসংখ্য ফ্যান-ফলোয়ার পায়। আমাদের ভাই-বোনদের অধিকাংশই আজকাল সোস্যাল মিডিয়া পোস্ট পড়ে দ্বীন শিখছে। তাই এ হাস্যকর অপপ্রচার নিয়ে অল্প হলেও আলাপ করা প্রয়োজন। উম্মাহর অংশ হওয়ার কারণে ক্ষেত্রবিশেষে এ আলাপটা একপ্রকার ফরজ।
তারা দাবী করে :
“আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া্তায়ালা যখন কোরআনে বলেছেন,
إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً
নিশ্চয় আমি পৃথিবীতে আমার খলিফা (প্রতিনিধি) প্রেরণ করব।
এখানে বলা হয়নি তিনি “পুরুষ খলিফা” পাঠাবেন। অতএব নারী-পুরুষ প্রত্যেকেই খলিফা, প্রত্যেকেই সমান, পুরুষ যা পারবে নারীরাও তা পারবে। নারীদেরকে সমাজ থেকে রাষ্ট্র অবধি বুঝে নিতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি.”
আসলেই তো! খলিফা মানেতো নারীরাও। কিন্তু…এখানে কিন্তু আছে।
তারা কোরআনের আংশিক আলাপ সামনে এনে বাদবাকিটুকু এড়িয়ে যাচ্ছে।
আমরা কোরআন ও হাদিস হতে এমন অসংখ্য প্রমাণ দেখাতে পারবো, যেখানে তাদের এরূপ বক্তব্যের খণ্ডণ করা হয়েছে।
যেমনঃ
১। আল্লাহ তায়ালা সূরা বাক্বারাতে বলছেন,
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ
আর পুরুষদের যেমন স্ত্রীদের উপর অধিকার রয়েছে, তেমনিভাবে নিয়ম অনুযায়ী স্ত্রীদেরও পুরুষদের উপর অধিকার রয়েছে। আর নারীদের ওপর পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে।[
২। সূরা নিসাতে বলছেন,
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ
পুরুষেরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল। আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্টত্ব দান করেছেন।
৩। একই সূরাতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ
আর তোমরা এমন সব বিষয়ে আকাঙ্খা করো না যাতে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের একের উপর অপরের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।
প্রশ্ন হলো, যদি নারী-পুরুষ সমান হয় ও প্রত্যেকে একইভাবে একই পর্যায়ের খলিফা হয়, তবে কেন আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে বলছেন, “আর তোমরা এমন সব বিষয়ে আকাঙ্খা করো না যাতে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের একের উপর অপরের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন”?
কেনই বা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কন্যা ফাতিমার (রা) বিয়ের পর তাঁকে ঘরের কাজ ও আলীকে (রা) বাইরের কাজের দায়িত্ব দিয়েছিলেন? তাহলে নবীজিও কি আমাদের সমাজের সব পুরুষের মতো নারীকে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে ঘরে আটকে রাখতে চেয়েছিলেন? (এমন কথা বলা ও ধারণা পোষণ করা থেকে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে হিফাজত করুন।)
তারা বলে, “পুরো পৃথিবীটাই মেয়েদের জন্য ঘর।”
যদি তাদের দাবী সত্য হয় তবে আল্লাহ তায়ালা কেন সূরা আহযাবে বলেছেন,
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ
এ আয়াতে কেন মুসলিম নারীদেরকে বলা হলো যে, “তারা যেন তাদের গৃহে অবস্থান করে?”
পুরো দুনিয়াটাইতো ঘর, তাহলে কি এ আয়াত নাজিল হওয়ার আগে নবীপত্নীগন পৃথিবীর বাইরে বসবাস করতেন? তাদেরকে কি সেখান থেকে পৃথিবীতে এসে অবস্থান করতে বলা হচ্ছে? কেনই বা কোনো কারণে বাইরে গেলে জাহিলিয়্যাহ যুগের নারীদের মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন করতে নিষেধ করা হচ্ছে? পুরো দুনিয়ায় যদি ঘর হয়, তবে বাইরে বের হওয়ার কথা কিভাবে আসে? জাহিলিয়্যাতের যুগে ঘরের বাইরে নারীরা ঠিক কোথায় সৌন্দর্য প্রদর্শন করত? মঙ্গল গ্রহে না কি বৃহস্পতি গ্রহে? নাকি চাঁদে গিয়ে তারা এসব করত? আপনারা হয়তো এ প্রশ্নগুলো শুনে হাসছেন। কিন্তু এ প্রশ্নগুলো উত্থাপন করতে হচ্ছে। তারা কোরআনের আয়াতের যে হাস্যকর অপব্যাখ্যা করে, তাতে দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান না থাকা ভাই-বোনেরাই নন, আমাদের অনেক “ইসলামি লেখক-লেখিকা”ও সমর্থন প্রদর্শন করেন। কিন্তু আমাদের কাছে তো এব্যাপারটা স্পষ্ট। আশা করছি পাঠকদের কাছেও স্পষ্ট যে, পুরো দুনিয়াকে মেয়েদের জন্য ঘর দাবী করার মাধ্যমে তারা ইসলাম সম্বন্ধে তাদের স্বল্পজ্ঞানের পরিচয় স্পষ্ট করে দিয়েছে।
তাদের অনেকে সরাসরি ক্বাওয়ামাহকে অস্বীকার করে, দাইউসের বিধান নিয়ে হাসাহাসি করে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। অথচ দাইউসের বিধান প্রসঙ্গে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হাদীসের মধ্যে স্পষ্ট বার্তা রয়েছে।
ক্বাওয়ামাহ একবিংশ শতাব্দীর মুসলিম সমাজের অন্যতম সংবেদনশীল এক বিধানে পরিণত হয়েছে। একবিংশ শতাব্দি মুসলিম ইতিহাসে এমন এক সময়, যা মুসলিমরা আগে কখনোই অবলোকন করেনি। খিলাফাহ পতনের পর থেকেই আমাদের অধঃপতন শুরু হয়েছে। আর একবিংশ শতাব্দীতে এসে তা চুড়ান্তরূপ ধারণ করেছে। আজ থেকে ১০০/২০০ বছর আগেকার মুসলিম সমাজে, “কেন পুরুষেরা চারজন বিয়ে করতে পারবে আর নারীরা পারবে না?”, ‘কেন ইসলামে সমকামিতা হারাম?”, “কেন নারী-পুরুষ সমান নয়?” “কেন নারীরা খলিফা হতে পারে না?” “কেন আন্তঃধর্মীয় বিয়ে বৈধ না?” ইত্যাদি- প্রশ্নগুলোর অস্তিত্ব ছিল না।
একইভাবে ক্বাওয়ামাহ নিয়ে বাড়াবাড়িও ছিল না। বলা বাহুল্য, কোনো সমাজে কখনো কখনো দুয়েকটা দুর্ঘটনা ঘটলে তা উদাহরণ হিসেবে বিবেচ্য হয় না। কেন ক্বাওয়ামাহ নিয়ে তখন কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না? এখন কেনই বা এসব হচ্ছে? এর উত্তরটা বেশ সহজ। খিলাফাহ ক্বায়েম থাকাকালীন সময়ে ইসলামী সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকা তুলনামূলক বেশ সহজ ছিল। ফলে নারীর উপর জুলুম করার দুঃসাহস কেউ দেখাতো না। তাছাড়া নারীর উপর জুলুম করাতে গৌরবের কিছু যে নেই-তা তৎকালীন মুসলিম পুরুষরা বেশ ভালোভাবেই বুঝত। এরপরেও যে দুয়েকটা ঘটনা ঘটেছে, সেসবক্ষেত্রে কেউই ছাড় পায়নি। পাশাপাশি মুসলিম নারীরাও তাদের ফিতরাত থেকে বিচ্যুত হয়ে ক্বাওয়ামাহকে অস্বীকার করত না.
কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে, বিশেষত নারীবাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের উত্থানের সময় থেকে মুসলিম নারীদের মধ্যে জেনে না জেনে ক্বাওয়ামাহকে অস্বীকার করার প্রবণতা তৈরি হতে থাকে। একবিংশ শতাব্দিতে এসে মুসলিম নারীদের মধ্যে এ রোগ ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্বাওয়ামাহ তথা পুরুষ তার অধীনস্থ নারীর প্রতি যে বৈধ কর্তৃত্বের অধিকারী হয় তা মূলত নারীর প্রতি তার ওপর ইসলাম প্রদত্ত কিছু দায়িত্বের কারণেই হয়ে থাকে। বরং বলা উচিত, ক্বাওয়ামাহ নিজেই একটা গুরুদায়িত্ব। পশ্চিমা দৃষ্টিকোণে “অধিকার” দ্বারা যা বুঝানো হয় ক্বাওয়ামাহ তা নয়। এমনকি ইসলামের কোনো বিধানই ঐ দৃষ্টিকোণে ব্যবহৃত প্রচলিত পরিভাষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
যা বলছিলাম, ক্বাওয়ামাহ একটা ফরজ বিধান। কোনো মুসলিম পুরুষ বা নারী কেউই ক্বাওয়ামাহকে অস্বীকার করতে পারে না। কেননা আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট(মুহকাম) ওয়াহীর মাধ্যমে ক্বাওয়ামাহর বিধান অবতীর্ণ করেছেন। কোরআনে বর্ণিত যেকোনো একটি সুস্পষ্ট বিধানকে অস্বীকার করা কুফরি।
আল্লাহ তায়ালা সূরা নিসাতে আমাদেরকে ক্বাওয়ামাহর ব্যাপারে বলছেন,
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ
পুরুষগণ নারীদের উপর কর্তৃত্ববান/প্রতি দায়িত্বশীল। কেননা আল্লাহ তায়ালা তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতো পুরুষগণ স্ত্রীদের জন্য তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে।
এখন কেউ যদি বলে, “তাহলে স্ত্রী যদি স্বামীর জন্য ব্যয় করে তবে কি স্ত্রী কর্তৃত্ববান হবে?”
উত্তর হচ্ছে, না। কেননা এ দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালা পুরুষদেরকে দিয়েছেন, নারীদেরকে নয়। তাই যারা ভাবে অর্থোপার্জন করে নিজেকে কিছু একটা প্রমাণ করা যাবে, স্বনির্ভর ও স্বাধীন হওয়া যাবে, তারা ভুল ভাবে। পরাজিত মানসিকতা থেকে অনেকেই অভিভাবকের অধীনে থাকাকে অপমানজনক মনে করে। তারা এটাকে দেখে পরনির্ভরশীলতা হিসেবে। একজন মুমিনা, মুসলিহা, মুসলিম নারী কিভাবে ভাবতে পারে যে, আল্লাহ তায়ালা তাকে কোনো বিধানের মাধ্যমে অপমানিত করবেন? অর্থোপার্জন প্রসঙ্গে আমরা সামনে আরো আলাপ করবো ইন শা আল্লাহ। এখানে এতটুকুই বলবো যে, আল্লাহর কাছে কিছু একটা হওয়ার জন্য নারীদের অর্থোপার্জন করাটা কোনো মানদণ্ডই নয়। তাছাড়া আল্লাহ তায়ালা যা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর তা পরিবর্তন করার সুযোগ নেই। যেভাবে সমস্ত পুরুষ তাদের দৃষ্টি অবনত রাখা শুরু করলেও মেয়েদের পর্দার বিধান পরিবর্তিত হবে না, ঠিক একইভাবে এখানেও তাই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালার আদেশই প্রত্যেক বিধান পালনে আবশ্যকতার মূল কারণ।
ক্বাওয়ামাহর সপক্ষে ও এ গুরুদায়িত্বের ব্যাপারে সতর্ক করে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْلَمَةَ، عَنْ مَالِكٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ دِينَارٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: أَلَا كُلُّكُمْ رَاعٍ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، فَالْأَمِيرُ الَّذِي عَلَى النَّاسِ رَاعٍ عَلَيْهِمْ، وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُمْ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ، وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُمْ، وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى بَيْتِ بَعْلِهَا وَوَلَدِهِ، وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْهُمْ، وَالْعَبْدُ رَاعٍ عَلَى مَالِ سَيِّدِهِ، وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُ، فَكُلُّكُمْ رَاعٍ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ صحيح
“‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে। জনগণের শাসক তাদের প্রতি দায়িত্বশীল। তাকে তাদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। পরিবারের কর্তা তার পরিবারের সদস্যদের প্রতি দায়িত্বশীল। তাকে তাদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। স্ত্রী তার স্বামীর সংসার ও সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীল। তাকে তাদের রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে। ক্রীতদাস তার মনিবের সম্পদের রাখাল, তাকে এ সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। সুতরাং তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে।
এ হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, ক্বাওয়ামাহ পশ্চিমা দৃষ্টিকোণে প্রচলিত “অধিকার” পরিভাষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো বিধান নয়। এটা কোনো অধিকার নয় যেখানে “পুরুষের ক্ষমতায়ন” হচ্ছে বলে নারীরাও ঐ অধিকার দাবী করতে চাইবে। ক্বাওয়ামাহ একটা দায়িত্ব। এমন দায়িত্ব যাতে উদাসীন হলেও জবাবদিহী করতে হবে। একইভাবে এ দায়িত্বকে ব্যবহার করে অধীনস্ত নারীদের উপর জুলুম করলেও জবাবদিহি করতে হবে।
পুরুষ যদি এ বিধানকে ব্যবহার করে জুলুম করার চেষ্টা করে, আমরা প্রয়োজনে জুলুমের প্রতিবাদ করতে পারি, করা উচিত। তা না করে পুরুষের ক্বাওয়ামাহকেই অস্বীকার করে বসা আমাদের জন্য বৈধ নয়। অথচ মডার্নিস্টরা বেশ জোরেশোরে নারী-পুরুষ সমান-ইত্যাদি যেসব শ্লোগান প্রচার করছে, তাতে অনেক মুসলিমই বিভ্রান্ত হয়, হচ্ছে। আমার এ লেখাটা পড়ার সময় অনেক বোনের মনে হয়তো এ প্রশ্নটা আসতে পারে যে, কেন পুরুষকে নারীর উপর ক্বাওয়ামাহ দেয়া হয়েছে?। শরঈ, বাস্তবিক, যৌক্তিক, “বিজ্ঞানসম্মত” ইত্যাদি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া যায়। তবে আমি উত্তর দেবো না। আমি বরং আপনাদেরকে কিছু প্রশ্ন করি।
১। কেন পুরুষের নারীর উপর ক্বাওয়ামাহ থাকা উচিত নয়? কেন নারী-পুরুষের শারিরীক, মানসিক ও আরো বিভিন্ন পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তাদের অধিকার ও দায়িত্বগুলো সর্বক্ষেত্রে একই হতে হবে? যদি একই হওয়া জরুরী না হয়, তবে কেন ক্বাওয়ামাহ নিয়ে আপনারা আপত্তি জানাচ্ছেন?
২। কেন এমন এক প্রশ্নের উত্তর আমাদেরকে দিতেই হবে, যে প্রশ্ন আমাদের পূর্বে তেরশত বছর যাবত ধরে মুসলিম নারীরা করেনি?
৩। কোন লেন্সে(দৃষ্টিকোণ/দৃষ্টিভঙ্গী) পুরুষের ক্বাওয়ামাহ আপনাদের কাছে অস্বাভাবিক, অযৌক্তিক বা অন্যায্য মনে হয়? ঐ লেন্সে কি ইসলাম নামক জীবনব্যবস্থাটি নিজেই অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক কিছু না? উত্তরটা স্বাভাবিকভাবেই হ্যাঁ হবে। তাহলে যে লেন্সে ইসলাম নিজেই একটা অযৌক্তিক ও অমানবিক জীবনব্যবস্থা, ঐ লেন্স দিয়ে কোন যুক্তিতে আপনারা ইসলামের কোনো বিধানকে পলিটিক্যালি কারেক্ট হিসেবে দেখতে চান? এ চাওয়াটাতো কষ্মিনকালেও পূরণ হওয়ার মতো কোনো চাওয়া নয়।
৪। যে লেন্সে দেখতে গিয়ে আপনার মনে প্রশ্ন জেগেছে, ঐ লেন্স কেন ও কিভাবে সঠিক,বাস্তবিক, যৌক্তিক এবং মানবিক? কিভাবে ঐ লেন্স ইসলাম অপেক্ষা অধিক উত্তম? যদি উত্তম না হয় তবে ইসলামকে বা ইসলামের কোনো বিধানকে কেন ঐ লেন্সে পলিটিক্যালি কারেক্ট হতে হবে?
আমি আবারো বলছি, ক্বাওয়ামাহর নামে মুসলিম নারীদের উপর অনেকক্ষেত্রে জুলুম হচ্ছে তা সত্য। কিন্তু ঐ জুলুমের বিরোধীতা করতে গিয়ে সরাসরি বা ইনিয়েবিনিয়ে নিজের মাহরাম পুরুষের বৈধ কর্তৃত্বকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
ক্বাওয়ামাহকে অস্বীকার করতে গিয়ে একটা কথা বেশ জোরেশোরে প্রচার করা হয়। তা হলো :
“আমরা কেবল আল্লাহর দাস, মানুষের দাস নই। তাই আমাদের উপর আমাদের স্বামীর বা বাবা-ভাইয়ের কর্তৃত্ব থাকতে পারে না। আমরা যখন বলি, “স্বামীর অনুমতি নিয়ে কি আমরা এটা বা ওটা করতে পারবো?” তখন আমরা নিজেদেরকে স্বামীর দাসী বানিয়ে নিচ্ছি। আমাদের দাসত্বের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদের মুক্তি মিলবে না ইত্যাদি ইত্যাদি।”
বেশ সুন্দর যুক্তি তাই না? একেবারে মনের কথাটাই তো বলে দিলো,তাই না? খাপেখাপ মিলে গিয়েছে। একটু থামুন!
আমরা অবশ্যই কেবল ও কেবলমাত্র আল্লাহ তায়ালার দাসত্ব করি। আর আল্লাহ তায়ালার দাসত্ব করি বলেই আমাদের উপর আবশ্যক হলো আল্লাহ তায়ালা হারাম করেননি ও আমাদের জন্য আবশ্যক করেছেন এমন বিষয়ে স্বামীর আনুগত্য করা। এটা দাসত্ব না। স্বামীর আনুগত্য ও স্বামীর দাসত্ব দুটো বিষয় কিন্তু এক না। উল্লেখ্য, একজন মুসলিম পুরুষের ন্যায়ই একজন মুসলিম নারী সত্ত্বাগতভাবে স্বাধীন। এমনকি বিয়ে না করে মিসকীনের মতো পরিবারহীনা একাকী জীবন পার করে দিতে চাইলে এ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রেও সে স্বাধীন। অবশ্য ইসলাম এমন জীবনযাপনকে উৎসাহিত করে না। কিন্তু কেউ তাকে এ ব্যাপারে জোরজবরদস্তি করতে পারবে না। তবে মানুষের ফিতরাত হলো তারা একা থাকতে পারে না। মানুষ মাত্রই সঙ্গী চায়। তাই যদি সে হালাল উপায়ে একজন জীবনসঙ্গী চায়, তবে তাকে অবশ্যই বিয়ে করতে হবে। এক্ষেত্রে স্বামীর সঙ্গ পেতে হলে দিনশেষে একজন স্বামীর প্রতি স্বামী হিসেবে আনুগত্য প্রদর্শন করতে হবে। যদি আনুগত্য করা থেকে কেউ মুক্ত থাকতে চায়, তার জন্য একমাত্র পথ হচ্ছে সামাজিক বিবাহিতা জীবন ত্যাগ করতে স্বামীর কাছে তালাক চাওয়া। আমি এব্যাপারটা অস্বীকার করবো না যে, আমাদের মুসলিম সমাজে এখন অনেক নারীই স্বামীর একপ্রকার দাসত্ব করে। কিন্তু তার অর্থ কি এই যে, এ অজুহাতে আমরা এখন স্বাভাবিক অবস্থায় স্বামীর অনুমতি নিয়ে কাজ করার/বাইরে বের হওয়ার আবশ্যকতাকে অস্বীকার করতে পারবো? এর অর্থ কি এটা যে, আমরা স্বামীর সাথে সহযোগীতাপূর্ণ আচরণের বদলে প্রতিযোগীতাপূর্ণ আচরণ শুরু করব? Logically, that doesn’t make any sense. যেখানে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস রয়েছে যে, নফল রোজা রাখতে গেলেও একজন স্ত্রীকে তার স্বামীর অনুমতি নিতে হবে ; সেখানে কোনো মুসলিম কিভাবে স্বামীর অনুমতি নিয়ে কোনো কিছু করতে চাওয়াকে স্বামীর দাসত্ব হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে? একজন স্ত্রীর ইজ্জত ও জীবনের নিরাপত্তার যে গুরুদায়িত্ব স্বামীর কাঁধে ন্যস্ত করা হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে স্বামী তার স্ত্রীকে প্রয়োজনে অনেককিছুতে অনুমতি না দিতেও পারে। তা কিভাবে প্রভূ-দাসের সম্পর্ক হতে পারে? সবথেকে গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো এসব কথাতে স্পষ্ট বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হাদীস অস্বীকার করা হয়। তারা হাদীস অস্বীকার করে এবং দ্বীনের ব্যাপারে স্বল্পজ্ঞান রাখা ভাই-বোনেদের মধ্যেও এ বিষক্রিয়া ছড়াতে থাকে। একই কথা মাহরাম ছাড়া সফরের বিধানের বেলাতেও প্রযোজ্য। তারা মনে করে, মাহরাম ছাড়াও একজন নারী নির্দিষ্ট দুরত্বের বাইরে স্বাভাবিক অবস্থায় ভ্রমণ করতে পারবে। এমনকি অনেকে মাহরামের অনুমতিরও তোয়াক্কা করে না। কারণ তাদের মতে, সবাই স্বাধীন। এখানেও কিন্তু তারা ইনিয়ে বিনিয়ে ক্বাওয়ামাহ অস্বীকার করছে ও হাদীস অস্বীকার করছে। And that’s highly problematic. এখানে বুঝা জরুরী যে, কেউ যদি একেবারে নিরুপায় হওয়া ব্যতীত তথা শরঈ অজুহাত ব্যতীত মাহরাম ছাড়া সফর করে, তবে সে গুনাহ করছে। কিন্তু যখন কেউ এ বিধানটাকেই অস্বীকার করে, তখন সে কুফরি করছে। এখানে এটাও উল্লেখ করা জরুরী যে, কেউ কুফরি করছে বলা মানেই তাকে কাফির আখ্যা দেয়া না। কাউকে কাফির আখ্যা দেয়ার জন্য অনেক শর্ত ও পথ অতিক্রম করা জরুরী। যাইহোক! ব্যাপারটা খেয়াল করুন, ক্বাওয়ামাহ, দাইউস, মাহরামের সাথে সফর করা এসব বিধান একটা অপরটার সাথে সম্পর্কযুক্ত। আপনি একটাকে অস্বীকার করলে আপনাআপনি আপনাকে অন্যগুলোও অস্বীকার করতে হবে। ফলে একটা কুফরি আপনাকে এক্ষেত্রে আরো অনেকগুলো কুফরি করতে বাধ্য করছে(আল্লাহ আমাদেরকে হিফাজত করুন)। নারীকেন্দ্রিক আরো বিভিন্ন রকমের কুফরি আদর্শকে তারা ইসলামের নাম দিয়ে মুসলিম সমাজে প্রচার করে। বিষয়টা কি কেবল এমন যে, আমাদের সহজ-সরল মুসলিম ভাই-বোনেরা কিছু কাগুজে সার্টিফিকেট দেখে তাদেরকে মহাজ্ঞানী ভেবে বিভ্রান্ত হচ্ছে? ব্যাপারটা আসলে এতোটাও সোজাসাপ্টা না। বরং আমি বলবো, এটা আংশিক সত্য। এর বিপরীতে আরেকটা সত্য হলো, অনেক ভাই-বোন তাদের মতগুলোকে গ্রহণ করছে ও প্রচার প্রসার করে যাচ্ছে একারণে যে, তাদের মতগুলো পশ্চিমা মতবাদের সাথে মানানসই। অন্যভাবে বলা যায়, পশ্চিমারা আমাদেরকে যে মনস্তাত্ত্বিক দাসত্বে বন্দী করে রেখেছে, সে দাসত্বপূর্ণ মানসিক অবস্থা এ মতগুলোকে ও আদর্শিক অবস্থানগুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে নেয়, এগুলো আমাদের “কমন সেন্সে” সঠিক বলে মনে হয়, তাই কোরআন বা হাদীসে কি বলা হয়েছে –তার বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে কিংবা কোরআনের আংশিক অধ্যয়ন করে আমাদের বহু ভাই-বোন এ মতগুলোকে গোগ্রাসে গিলছে। এ শ্রেণীর উদাহরণ হলো তাদের ন্যায় যাদের ব্যাপারে কোরআনে বলা হয়েছে :
فَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاه
আপনি কি তার প্রতি লক্ষ্য করেছেন, যে তার খেয়াল-খুশীকে স্বীয় উপাস্য স্থির করেছে?
২। মডারেট :
এরা অনেকেই প্রথম শ্রেণীর সাথে সুসম্পর্ক রাখে। তবে এদের সবার কথাতে সুস্পষ্ট কুফরি পাওয়া যায় না। কিন্তু প্রথম দলের অনেক কুফরি কথাবার্তাতে তথা লেখনীতে তারা সুন্দর সুন্দর মন্তব্য করে। তারা কি বুঝে না যে, কুফরি কথাবার্তাতে সমর্থন দেয়া মুসলিম নারী বা পুরুষ কারোর জন্যেই বৈধ নয়? আল্লাহ তায়ালাই তাদের অন্তরের ব্যাপারে সর্বাধিক অবগত।
প্রথম দল থেকে একটু উদারপন্থী এ শ্রেণীর বোনদের ভাবটা এমন যে, নারীর বাইরে আসা নিয়ে কথা বলতেই হবে। নারী বাইরে কিভাবে আসতে পারে তা নিয়েই তাদের সব আলাপ। মুসলিম নারীর অর্থনৈতিক মুক্তিই তার সম্মানের একমাত্র মানদণ্ড। জরুরী না যে, তারা এটা মুখে বলবে। বরং তাদের কথাবার্তা, লেখালেখিতে তাদের পাঠকশ্রেণী কখনো না কখনো এভাবেই ভাবতে শুরু করে। কেননা তারা জেনে বা না জেনে এই আকিদায় বিশ্বাস রাখে। অথবা, তারা বিশ্বাস না রাখলেও যে পদ্ধতি তারা গ্রহণ করেছে, ঐ পদ্ধতি দিনশেষে এরূপ ফলাফল ব্যতীত কোনোকিছুই প্রদান করে না। ফলে অনেক বোনেরা গৃহিণী হওয়াকে কিছুই না মনে করে হীনমন্যতায় ভুগে। ব্যাপারটা এমন যে, আমাকে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। আর প্রমাণ করার একমাত্র মাধ্যম অর্থোপার্জন করা।
নারী-পুরুষের ব্যাপারে তাদের দাবীর সারাংশ কিছুটা এমন :

“আসলে আমরা সমান না। আমাদের মধ্যে তফাৎ আছে। “
তফাৎ/পার্থক্য ও শ্রেষ্ঠত্বের মধ্যে যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান তা হয়তো তারা বুঝেই না। তাদের বক্তব্যের সারাংশটা একারণে এমন :
“আল্লাহ তায়ালা কিছুতেই পুরুষকে নারীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিতে পারেন না। এগুলো স্রেফ পার্থক্য। আমাদের মধ্যে পার্থক্যগুলো আমাদের কাউকে একে অপর থেকে শ্রেষ্ঠ বানায় না। তবে আমরা সমান না। আমাদের মধ্যে তফাৎ/পার্থক্য আছে।”
হুবহু এসব বলা সম্ভব না। তাই একটু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বললেও সারাংশটা এমনই। ঘুরেফিরে একই কথা। সরাসরি না বলে ইনিয়ে বিনিয়ে ক্বাওয়ামাহকে অর্থহীন সাব্যস্ত করা। বিভিন্ন বিধানে নারীর উপর পুরুষের আল্লাহ প্রদত্ত শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্যকে অস্বীকার করা। অবাক করা ব্যাপার হলো, যেসব বিষয়ে নারীদের মর্যাদা দেয়া হয়েছে সেসব ব্যাপারে কিন্তু তারা বলে না, নারী এখানে অধিক মর্যাদা পাচ্ছে না। তখন তারা বলে না, নারী-পুরুষ সমান। নারীর মার্তৃত্বের মর্যাদা ও দায়িত্ব নিয়ে আলাপ আনলেও পুরুষের পিতৃত্ব ও অন্যান্য দায়িত্বও যে একইভাবে ক্ষেত্রবিশেষে সেসবক্ষেত্রে নারীর ভুমিকা অপেক্ষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাধান্য পায়-তা তারা কোনোভাবেই স্বীকার করে না। স্বীকার করা দূরে থাক, এসব কথা মুখেই নেবে না। মানে পুরুষের বেলায় তারা দেখাতে চাইবে এটা একটা পার্থক্য মাত্র, শ্রেষ্ঠত্ব না। আবার নারীর বেলায় এসে, নারীর বিশেষ মর্যাদাগুলো ঠিকই শ্রেষ্ঠত্ব। ইসলাম যেন female supremacy-কে উৎসাহিত করছে(আল্লাহ এমন ধারণা ও বিশ্বাস থেকে আমাদের হিফাজত করুন)। আবারো বলছি, জরুরী না যে, এসব কথা সরাসরিই বলবে। কিন্তু সারাংশ এটাই। প্রথম দলটি সরাসরি পুরুষদের সাথে নারীদের সম্পর্ক প্রতিযোগিতার ও বিদ্বেষের হিসেবে প্রদর্শন করে। তারা নারী-পুরুষের সম্পর্ককে দেখায় “জনমজনমের/অনেক কালের শত্রুতা” হিসেবে। আর তাদের থেকে একটু উদার এ দ্বিতীয় দলের বোনেরা ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে চায়, পুরুষরা কাপুরুষ হয়ে গিয়েছে বলে নারীদেরকে পুরুষের মতো হতে হবে। একজন নারীর প্রথম স্থান যে তার ঘর- তা তারা মুসলিম নারীদের মনে করিয়ে দেবে না। বরং শক্তি,সাহস, আর্থিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সর্বক্ষেত্রে নারীকে পুরুষ করে তোলার এক অবাস্তব, অযৌক্তিক ও অমানবিক প্রবণতাকে তারা গ্রহণ করেছে। আর এটাকেই তারা প্রচার করছে। “হিজাব করে সব করা যায়”- শ্লোগান তারা সরাসরি না দিলেও, “হিজাব করে যে কেউ যে কোনো অবস্থাতে চাকরি করতে পারবে”- এটা কিন্তু তারা দাবী করে। তারা উম্মাহর সম্মানিত মুসলিমাহদের কাউকে বর্তমানের single mother, working mother হিসেবে উপস্থাপন করে।
মুসলিম মেয়েরা বাইরে কাজ করতে পারবে কি না-এটা একটা শরঈ প্রশ্ন। এ প্রশ্নের উত্তর প্রদান করা হবে কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও ক্বিয়াসের ভিত্তিতে। পরিস্থিতি ও ব্যক্তিভেদে হুকুম ও ভিন্ন হয়। কিন্তু তারা এ ব্যাপারটাকে কেন্দ্র করে কী করে? মহিলা সাহাবিয়্যাতদের উদাহরণ আনে।
প্রথমত, শরীয়াহর মূলনীতি অনুযায়ী এটা কি কোনো মূলনীতির আওতায় পড়ে? সাহাবিয়্যাহগণ যদি কাজ না করতেন, তবে কি মেয়েদের অন্য সময় বাদ দেই, অতি-প্রয়োজনে কাজ করাও হারাম হয়ে যাবে? উত্তর হলো, না। অতএব তাদের প্রমাণটা প্রমাণ না বরং লজিক্যাল ফ্যালাসি। তর্কের খাতিরে যদি প্রমাণ হিসেবে ধরেও নিই, এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো :
১। মহিলা সাহাবিয়্যাতদের কাজের ধরণ আর তাদের কাজের ধরণের ভিন্নতা নিয়ে কেন তারা আলাপ করে না?
২। মহিলা সাহাবিয়্যাতরা যে নিজেদেরকে সমাজে কিছু একটা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে বা “আরেকটু ভালো থাকার জন্যে” নয় বরং জীবিকার তাগিদে কাজ করতেন, তা কেন তাদের লেখনীতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফুটে উঠে না?
৩। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, মহিলা সাহাবিয়্যাতরা যে বিশ্বব্যবস্থার অধীনে থেকে কাজ করেছেন, সে বিশ্বব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে মহিলা সাহাবিয়্যাতদের উদাহরণ প্রদান করা কি লজিক্যাল ফ্যালাসি না? হঠকারিতা না? এটাতো মৌলিক আলাপ। এটাকে কেন তারা এড়িয়ে যাচ্ছে?
আমি মুসলিম ভাই-বোনদের প্রতি সুধারণা প্রদর্শনপূর্বক বলবো, তারা না বুঝে একটা অযৌক্তিক আর্গুমেন্ট পেশ করছে। কিন্তু এরপরেও সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। সমস্যা কেবল এটা না যে, তারা একটা ভুল পদ্ধতি ও ভুল প্রমাণ উপস্থাপন করছে। আরো অনেক সমস্যার একটি হলো, তাদেরকে উলামাদের মত জানানো হলে তারা বলে, সংস্কৃতি ও পরিস্থিতিভেদে ফাতওয়া ভিন্ন ভিন্ন হয়। আমরা যদি তাদের কথা মেনেও নেই, তবে প্রশ্ন হলো তাদের অবস্থানের জন্য কুফা’র ফাতওয়া যথেষ্ট না হলে ঠিক কোন এলাকার ফাতওয়া গ্রহণযোগ্য?
সাব-সাহারার?
না।
হিজাজের?
না।
সিরিয়ার?
না।
ইয়েমেনের?
না।
পশ্চিমের, জ্বি পশ্চিমের।
হাস্যকর না? নারীদেরকে কেন্দ্র করে হিজাজ, ইয়েমেন, কুফা, বসরা, সিরিয়া, সাব-সাহারা প্রভৃতি সব এলাকার সর্বযুগের সকল ইমামগণের ফাতওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। আর উপমহাদেশের ইসলাম তো ইসলামই না। কেবল পশ্চিমের এক শ্রেণীর শাইখরা যা বলে তাই ইসলাম। তাই প্রকৃত ও বিশুদ্ধ ইসলাম। যে পশ্চিমের কারণে মুসলিমদের দুরবস্থা, যাদের ষড়যন্ত্রে আমাদের ভাই-বোনদের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়েছে এবং আমরা অভিভাবকহীন হয়ে ৯০ বছরেরও অধিক সময়কাল অতিবাহিত করছি, সেই পশ্চিমে বসবাস করা এক শ্রেণীর শাইখরাই প্রকৃত ইসলামিস্ট। তাদের বিচ্ছিন্ন মতামতগুলো ছাড়া বাদবাকি সবার ফাতওয়া নিজ নিজ এলাকার সংস্কৃতি প্রভাবিত ও একপেশে। পশ্চিমা প্রভূদের মতবাদের সাথে খাপ খাওয়া “এমপাওয়ার্ড কুল উইমেন” বানানোর ফাতওয়াগুলোই একমাত্র সঠিক ফাতওয়া। কতোটা পরাজিত মানসিকতাসম্পন্ন ও মগজ বিকিয়ে দেয়া মানুষ হলে কেউ এধরণের মানদণ্ড নির্ধারণ করে!
তারা কি জেনেবুঝে ইচ্ছে করে কলোনিয়ালাইজড মানসিকতা গ্রহণ করেছে? হয়তো না। মুসলিমদের প্রতি সুধারণা রাখতে হয়। তাই ধরেই নিচ্ছি হয়তো এসবকিছু অনিচ্ছেকৃত। কিন্তু তাতে তো ফিতনা থেমে থাকছে না। ফিতনা বৃষ্টির মতো ধেয়ে আসছে। দূর্ভাগ্যবশত তাদের মাধ্যমেও ফিতনা বৃষ্টির মতো ধেয়ে আসছে।
তাদের অনেকে আবার মুসলিম বংশদ্ভুত কট্টর ইসলাম বিদ্বেষী নারীবাদীদেরকে নারীমুক্তির অগ্রদূত হিসেবে ভালোবেসে সম্মান করে। একইসাথে তারা ফলাও করে নারী মুহাদ্দিসাহ, নারী ফক্বীহাহদের ইতিহাস প্রচার করে। তাদের আদর্শিক অবস্থানটা কিছুটা জগাখিচুড়ি অবস্থান। এখানে বলা জরুরী যে, যারা যারা নারী মুহাদ্দিসাহ ও অন্যান্য মুসলিমাহ স্কলারদের ব্যাপারে কথা বলে তাদের সবাই এক নয়। কেননা দুদলের আলাপের উদ্দেশ্য ভিন্ন ভিন্ন। একদল যারা প্রথম শ্রেনীর তথা মডার্নিস্ট ভাই-বোনেদেরকে সমর্থন করে, তাদের অবস্থান যে স্বেচ্ছায় কিংবা অজান্তে, অনিচ্ছাতেই পরাজিত মানসিকতাযুক্ত, পশ্চিমা ইসলামের অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হয়তো তারা অনেকেই জেনে করছে না। কিন্তু দিনশেষে তারা পরাজিত মানসিকতা থেকেই করছে। দ্বিতীয় দলের ব্যাপারটা তেমন না। আর তারা আমাদের আলোচনার বিষয়ও না। একটা উদাহরণ দিয়ে এব্যাপারটা স্পষ্ট করা যাক।
আমাদের বিশ্বাসমতে, দুনিয়া ও আখিরাতের চার শ্রেষ্ঠ নারীদের (আসিয়া, মারইয়াম,খাদিজা, ফাতিমা) কেউই যোদ্ধা হওয়ার কারণে বা সরকারী বড় কর্মচারী বা বিজনেস উইমেন হওয়ার কারণে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেননি।। তাদের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ কি ছিল? প্রথমত তাদের তাক্বওয়া। তাক্বওয়ার কারণেই মা খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শ্রেষ্ঠ স্ত্রীর মর্যাদা অর্জন করেছেন। ব্যাপারটা এমন ছিল না যে, তিনি সারাদিন রান্নাঘরে কাটিয়েছেন আর নবীজি সে সুবাদে ভোজনবিলাশ করে কাটিয়েছেন। বরং তিনি সর্বাবস্থায় নবীজির সাথে ছায়ার মতো থেকেছেন। তাঁর সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়েছেন। নবীজির মন খারাপ হলে তাঁকে ভরসা জুগিয়েছেন। তিনি তাঁকে আমৃত্যু এতটাই ভালোবেসেছেন যে, আমাদের এই বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যুর পরেও নবীজি তাঁকে ভুলে যাননি। কখনোই তাঁর স্থান অন্য স্ত্রীদের কাউকে দেননি। হাদীসে আমাদের মায়ের ব্যাপারে অসংখ্য ফজিলতপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে। আমরা এখানে কেবল দুটো হাদীসে উদ্ধৃত করবো।
১।
عن عَائِشَةَ رضي الله عنها قالت ما غِرْتُ على امْرَأَةٍ ما غِرْتُ على خَدِيجَةَ من كَثْرَةِ ذِكْرِ رسول اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِيَّاهَا

আঈশাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি কোনো মহিলাকে খাদিজার(রা) মতো ঈর্ষা করিনি। কারণ নবীজি তাঁকে অত্যধিক স্মরণ করতেন।
২।
عن عَائِشَةَ قالت كان النبي صلى الله عليه وسلم إذا ذَكَرَ خَدِيجَةَ أَثْنَى عليها فَأَحْسَنَ الثَّنَاءَ قالت فَغِرْتُ يَوْماً فقلت ما أَكْثَرَ ما تَذْكُرُهَا حَمْرَاءَ الشِّدْقِ قد أَبْدَلَكَ الله عز وجل بها خَيْراً منها قال ما أبدلني الله عز وجل خَيْراً منها قد آمَنَتْ بي إِذْ كَفَرَ بي الناس وصدقتني إِذْ كذبني الناس وواستني بما لها إذا حرمني الناس ورزقني الله عز وجل وَلَدَهَا إِذْ حرمني أَوْلاَدَ النِّسَاءِ.
আঈশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, যখনই নবীজি খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার কথা স্মরণ করতেন, তিনি তাঁর খুব প্রশংসা করতেন। একবার আমি ঈর্ষাবশত নবীজিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কেন ঐ বৃদ্ধা মহিলাকে স্মরণ করেন? আল্লাহতো আপনাকে তার চেয়েও উত্তম স্ত্রী দান করেছেন(তিনি এখানে নিজের দিকে ইঙ্গিত করেছেন)।” নবীজি উত্তরে বলেন, “আল্লাহ তায়ালা আমাকে খাদিজা অপেক্ষা উত্তম কোনো স্ত্রী দান করেননি। খাদিজা আমাকে তখন বিশ্বাস করেছিল, যখন লোকেরা আমায় অবিশ্বাস করেছে। সে তখন আমাকে (নবুওয়াতের সত্যতার ব্যাপারে) গ্রহণ করেছিল, যখন লোকেরা আমায় প্রত্যাখ্যান করেছে। সে তখন আমাকে তার সম্পদ দ্বারা সাহায্য করেছিল, যখন লোকেরা আমায় ছেড়ে গিয়েছে। আর আল্লাহ তায়ালা আমাকে কেবল তাঁর গর্ভে সন্তান দান করেছেন। অন্য কোনো স্ত্রীর গর্ভে আমাকে সন্তান দান করা হয়নি।”
আমাদের মা খাদিজা নবীজির এগারজন স্ত্রীর একমাত্র স্ত্রী, যিনি নবীজির সন্তানদের জন্ম দেয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। তাঁর গর্ভেই দুনিয়া ও আখিরাতের চার শ্রেষ্ঠ রমণীদের আরেকজন, ফাতিমা জন্মেছেন। যার ব্যাপারে বলা হয়, “ফাতিমা তো ফাতিমাই।” হাদীস থেকে জানা যায়, হযরত ফাতিমা (রা) কঠোর পরিশ্রম করতেন। দুঃখজনক সত্য হলো, মুসলিম নারীদের, বিশেষত উপমহাদেশীয় মুসলিম নারীদেরকে দিনরাত খাটিয়ে মারার জন্য আমাদের সমাজের বহু পুরুষেরা হযরত ফাতিমা সংক্রান্ত হাদিসের অপব্যবহার করে। অথচ প্রচুর পরিশ্রম করা ফাতিমার জীবনে এমন দিনও গিয়েছে যে, তিনি পরিবারসহ অনাহারে কাটিয়েছেন। নবীকন্যার পরিশ্রম পুরুষেরা দেখে। কিন্তু কতোটা ভালোবাসলে স্বামী (আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর স্ত্রীর পিঠের ক্ষত দেখে কষ্ট পায়, কতোটা ভালোবাসলে স্ত্রীর সাহায্যের জন্য দাসী চাওয়ার কথা ভাবে- এ বিষয়গুলো এসকল পুরুষেরা একেবারেই এড়িয়ে যায়। পুরুষেরা ফাতিমার মতো স্ত্রী চায়, তবে আলী হতে চায় না। খাদিজার মতো স্ত্রী চায়, তবে নবীজি যেমন স্বামী ছিলেন তেমনটা হওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেন না।
মারইয়াম আলাইহিস সালাম সতিসাধ্বী ছিলেন। তাক্বওয়াবান ছিলেন। তাঁর মা পুত্র সন্তান জন্মালে বায়তুল মুকাদ্দাসের সেবায় সে সন্তানকে নিযুক্ত করবেন বলে ঠিক করেছিলেন। মারইয়ামের জন্মের পর পুত্রসন্তান না হওয়াতে তাঁর মা যখন হতাশ হয়ে পড়েন, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তার মাকে জানিয়ে দেয়া হয়,
وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا وَضَعَتْ وَلَيْسَ الذَّكَرُ كَالْأُنثَىٰ

বস্তুতঃ সে কি প্রসব করেছে আল্লাহ তা ভালই জানেন। কোনো পুত্র সন্তানই সেই কন্যার সমান নয়।[4]
এত বড় কথা কেন বলা হয়েছিল? কেন মারইয়ামের মর্যাদা এতবেশি? কেন বলা হলো তাঁর মতো তো কোনো পুরুষ নেই? কেন বলা হলো যে, মারইয়ামের মা কি প্রসব করেছে তা আল্লাহই ভালো জানেন? মারইয়াম কি বড় হয়ে বিজনেস ওম্যান হয়েছিলেন? কোনো বড় চাকরি-বাকরি করেছেন? উচ্চশিক্ষিত ছিলেন? তার কি অনেকগুলো ডিগ্রী আর সার্টিফিকেট ছিলো? কোনোটাই না। তিনি ঈসা আলাইহিস সালামের মা ছিলেন। কোনো পুরুষের স্পর্শ ও শুক্রাণু ব্যতিত পৃথিবীতে তিনি মা হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। মারইয়াম মারইয়াম হওয়া ছাড়া তাঁর কেবল একটাই পরিচয় ছিল। তা হলো, তিনি ঈসা আলাইহিস সালামের মা। আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নির্বাচিত একজন নবী, আল্লাহ তায়ালার পছন্দের একজন মানুষের মা। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে এমন কারামাহ দান করেছেন যে, তার সন্তান জন্মের পরই মায়ের সতীত্বের সাক্ষ্য দিয়েছে।
মারইয়ামের শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই। তিনি ঈসা আলাইহিস সালামের মা। আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নির্বাচিত একজন নবী, আল্লাহ তায়ালার পছন্দের একজন মানুষের মা। মারইয়ামের শ্রেষ্ঠত্ব এটাই যে, প্রথমত তিনি নিজে পূণ্যবতী ছিলেন। দ্বিতীয়ত, তিনি একজন পূণ্যবান সন্তানের মা ছিলেন।
আসিয়া আলাইহিস সালাম একজন মুমিনা, মুসলিহা এবং নিঃসন্তান মহিলা ছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁকে একজন নবীর পালক মা হওয়ার সৌভাগ্য দান করেছেন। জালিমের ঘরে তিনি জালিমের বিরুদ্ধে আল্লাহ তায়ালার সৈন্যকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন। এখানেও, আসিয়া একজন মুয়াহহিদা। আসিয়া একজন মা। আসিয়ার আসিয়া হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পরিচয় যদি থেকে থাকে, তা হলো, তিনি মূসা আলাইহিস সালামের মা। মুসা আলাইহিস সালামকে জন্ম না দিয়েও আসিয়া তাঁর মা। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে এ সৌভাগ্য দান করেছেন। তাঁকে তিনি এতবড় গুরুদায়িত্ব প্রদানের জন্য পছন্দ করেছেন। কেন? কারণ তিনি ছিলেন একজন মুমিন, মুত্তাক্বি, মুসলিহা এবং মুয়াহহিদা।
মোদ্দাকথা, এ চারজন সম্মানিত মহিলার মধ্যে সাধারণ গুণাবলী হলো, তারা সকলেই মুয়াহহিদাহ, মুসলিমাহ,মুমিনা,মুসলিহা, মুত্তাকি ও ভালো মা ছিলেন। তাঁদের দুজন ভালো স্ত্রীও ছিলেন। একজন ভালো মা অবশ্যই একজন ভালো স্ত্রী হবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে তাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের মূল কারণ সব কিছুর আগে তাদের তাক্বওয়া। তারপর তাঁদের ভালো মা হতে পারা। তাহলে ইসলামে একজন নারীর শ্রেষ্ঠত্বের প্রকৃত মানদণ্ডটা আসলে কি – সেটা নিয়ে কি তারা আলাপ করছে? অদ্ভুতভাবে এ শ্রেণীর বোনেরা এ চারজনের নামই নেন না। যদিও বা নিয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে আম্মাজান খাদিজার নাম নেয়া হয়।
কেন?
তাকে বিজনেস ওম্যান প্রমাণ করতে।
“প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী মুসলিমাহ একজন বিজনেস ওম্যান। পশ্চিমারা দেখো! ইসলাম কতোটা মহান। ইসলাম নারীর ক্ষমতায়নে শুরু থেকেই এগিয়ে”- ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমাদের মা বর্তমান যুগের বিজনেস ওম্যান ছিলেন না। এব্যাপারে আমি আমার অন্য এক আর্টিকেলে ইতিমধ্যেই আলাপ করেছি। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই তিনি তথাকথিত বিজনেস ওম্যান ছিলেন, তাও এটা কিন্তু তার শ্রেষ্ঠত্বের কারণ ছিল না।
তারা নুসাইবা বিন্ত কা’ব, আসমা বিন্ত উমাইস, খাওলাদের (রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম) উদাহরণ বেশ জোরেশোরে প্রচার করেন। নিঃসন্দেহে সমস্ত সাহাবিয়্যাহ আমাদের মাথার তাজ। তাঁরা আল্লাহ তায়ালার প্রতি ও আল্লাহ তায়ালা তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। তাঁরা আখিরাতকে কিনে নিয়েছেন। তাঁদের যেকোনো একজনের শানে সারাজীবন লিখে গেলেও তাঁদের শান পুরোপুরিভাবে বর্ণনা করা সম্ভব না। তাঁদের তুলনা তাঁরাই! এমন না যে, আমরা তাঁদের বীরত্বের আলাপ করবো না। কিন্তু তাঁদেরকে যেকারণে ও যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে সে কারণ ও পদ্ধতিটা যেহেতো সমস্যাপুর্ণ, তাই আমরা এসবের বিরোধীতা করি ও করব। কেন শ্রেষ্ট চার মুসলিমাহ তাদের আলাপে থাকে না এবং কেন কেবল তাঁরাই থাকে যাঁদেরকে পোস্টমডার্ন বিশ্বব্যবস্থায় এমপাওয়ার্ড হিসেবে উপস্থাপন করা যায়? কেন হযরত সাফিয়্যাহ থাকেন না? কেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এগারজন স্ত্রীদের মধ্যে কেবল আঈশা ও খাদিজাহ (ভূলভাবে উপস্থাপনের জন্য) থাকেন? বাকিরাও তো আমাদের মা। কেন বাকিদের নিয়ে কথা বলা হয় না? কেন? এই প্রশ্ন করাটা জরুরী, খুবই জরুরী।
পশ্চিমা কাঠামোর ভিতরে থেকে সমালোচনা বা জীবনযাপনের যে আলাপ আমরা শুনি, সেক্ষেত্রে যতটুকু করা যায় তারা ততটাও করে না। তারা এর চেয়েও বেশি উদার তথা বেশিই সমঝোতামূলক আচরণ করে। যাকগে! আমরা অবশ্যই নুসাইবাদের নিয়ে আলাপ করবো, কিন্তু মুসলিম নারীদেরকে এমপাওয়ার্ড প্রমাণ করার জন্য না। আমাদের ইতিহাসকে পশ্চিমা মানদণ্ডে পলিটিক্যালি কারেক্ট প্রমাণ করার জন্যে না। কারণ পশ্চিমা মানদণ্ড আমাদের মানদণ্ড না। এ সকল বোনেরা মুখে নিজেদের পরাজিত মানসিকতার কথা স্বীকার করুক বা না করুক, তাদের কাজে প্রকাশ পায় যে, তারা মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে কলোনিয়ালাইজড। অতএব, আমরা তাদের পদ্ধতিকে গ্রহণ করবো না। কারণ এটা পশ্চিমাদের থেকে ধার করে আনা পদ্ধতি। আমাদের নিজেদের আলাদা পদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন তাদের ঠিক করে দেয়া পদ্ধতিকে গ্রহণ করব? আমাদের মানদণ্ডে কোনো লিঙ্গের ক্ষমতায়নের অস্তিত্বই নেই। আমরা নারী বা পুরুষের না বরং ইনসাফের ক্ষমতায়ন তথা প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী। একারণে গুটিকয়েক ক্ষেত্র বাদে কোনো কাজ নারী করল না কি পুরুষ তাতে আমাদের আসলে কিছু যায় আসে না।
আমরা ফলাও করে বলি না যে, “দেখো, আমাদের মেয়েরা এটা করেছে, ওটা করেছে! ওম্যান পাওয়ার!”- ইত্যাদি ইত্যাদি। “male/female power” টার্মগুলো বা এগুলো দ্বারা যা কিছু বুঝায় তা আমাদের নিজস্ব কিছু না। এগুলো পুরোই বাকওয়াস। ইসলাম female supremacy বা male supremacy দুটোর একটারও পক্ষে না। তাছাড়া পশ্চিমারা যেসব বিষয়কে অধিকার হিসেবে দেখে, ইসলামে সেসবকে দেখা হয় দায়িত্ব হিসেবে। খিলাফাহ আমাদের অধিকার না, বরং একটা গুরুদায়িত্ব। রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমতা বলতে পশ্চিমারা ক্ষমতা লাভ করাকে বুঝে থাকে। আর ইসলাম আমাদেরকে শিখিয়েছে, খিলাফাহ একটা গুরুদায়িত্ব। যেকোনো কিছুতে তারা যেটাকে ক্ষমতা হিসেবে দেখাতে চায়, ইসলাম সেটাকে দায়িত্ব হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ফলে পশ্চিমা যেকোনো মতবাদের লেন্স দিয়ে ইসলাম সম্মত জীবনযাপন করতে চাওয়া কিংবা ইসলামের বিধানগুলোকে পলিটিক্যালি কারেক্ট করতে চাওয়ার স্বপ্নটা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। এক্ষেত্রে হয় এ স্বপ্ন পূরণ হবে না, অথবা সেসকল মুসলিম ভাই-বোনেদের জীবনে ইসলাম আর ইসলামই থাকবে না।
একটা বিষয় বুঝা বেশ জরুরী। আরব মহিলাদের জন্য যোদ্ধা হওয়াটা স্বাভাবিক হতে পারে। আরো বিভিন্ন দেশের ভৌগোলিক কারণে বিভিন্ন বৈধ বিষয় স্বাভাবিক হতেই পারে। তবে সাধারণভাবে জাতি হিসেবে মুসলিম নারীদের জন্য যোদ্ধা হওয়াটা প্রচলিত স্বভাবজাত কোনো বৈশিষ্ট্য না। বরং অগণিত যোদ্ধা তৈরি করাটা আমাদের জাতির নারীদের জন্য স্বাভাবিক বিষয় ছিল। আমাদের ইতিহাসে বহু নারী যোদ্ধা ছিলেন। কিন্তু তাঁরা আমাদের ইতিহাসের সমস্ত নারীদের তুলনায় সংখ্যায় একেবারেই সামান্য। আমাদের ইতিহাস বরং যোদ্ধা তৈরির কারিগর নারীদের দ্বারাই বেশি পরিপূর্ণ। আমাদের ইতিহাস নারী খলিফা বা নারী সেনাপতি দিয়ে নয় বরং খলিফা এবং সেনাপতি তৈরির মাধ্যম হওয়া নারীদের দ্বারা পরিপূর্ণ। মুসলিম ইতিহাসে যখন পুরুষদের অবস্থা খুবই করুণ ছিল, কেবল তখনই গুটি কয়েক নারী একপ্রকার বাধ্য হয়ে সাম্রাজ্যের ভার নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। নিজেদেরকে এমপাওয়ার্ড প্রমাণের জন্য বা নিজেদেরকে প্রমাণ করতে কিছু একটা করতে হবে –এমন মানসিকতা থেকে তারা কিছু করেননি। বরং দায়িত্ব নিতে হচ্ছে বলে বাধ্য হয়ে নিয়েছেন। তাই এক্ষেত্রে সুপারিয়র ফিল করার কিছুও ছিল না।
তথাকথিত ‘women leadership’ এর অস্তিত্ব আমাদের ইতিহাসে নেই। আমাদের ইতিহাসে ultimate leadership/sovereignty আল্লাহ তায়ালার। তাঁর খলিফা হিসেবে রাষ্ট্রপ্রধানরা দায়িত্ব পালন করে এসেছে। এবং স্বাভাবিকভাবে তাঁরা পুরুষ ছিলেন। এটাই স্বাভাবিক। আমাদের আলোচনা যেহেতো পুরুষের খিলাফাহর কারণ নিয়ে না তাই আমি এনিয়ে খুব বেশি আলাপ করতে চাই না। কিন্তু স্বাভাবিক পরিস্থিতির বাইরে এতদভিন্ন যা কিছু তা স্বাভাবিক না। তা আমাদের জন্য কল্যাণকর না। তা আমাদের ফিতরাতের সাথে যায়ই না। এ কথাগুলো আমাদের এসকল বোনেরা কখনোই বলে না। কারণ তারা পোস্টমডার্ন বিশ্বব্যবস্থা দ্বারা প্রভাবিত।
একইভাবে আমরা ফাতিমা বিন্ত সা’দ আল খাইরের ব্যাপারে বলব, আমাদের মা আঈশাহর ব্যাপারেও বলব। কিন্তু সেকুলার সোসাইটিতে নিজেদেরকে এলিট বা নিজেদের ধর্মকে সভ্য, আধুনিক, নারীর ক্ষমতায়ন মনস্ক ধর্ম ইত্যাদি প্রমাণ করার জন্যে না। আমাদের ধর্মে নারী-পুরুষ সবার জন্যেই ইলম অর্জন ফরজ। ইলম অর্জনের এ জায়গাতে এসে আমি কোনো প্রকার পার্থক্যের কথা বলবো না, কারণ ইসলামের ভাষ্য এমন না। আমাদের অগণিত মুহাদ্দিসাহ আছেন, ফক্বীহাও ছিলেন, আছেন। এমনকি আমাদের অনেক বিজ্ঞানী মুসলিমাহ ছিলেন, যাদের শানে তাদের সময়ের বড় বড় ইমামগণের প্রশংসামূলক উক্তি রয়েছে। আনসারি সাহাবিয়্যাহদের ফিক্বহের প্রতি আকর্ষণের কারণে হাদীসে তাদের প্রশংসা পাওয়া যায়। আরব বিশ্বে এখনো মুসলিমাহ মুহাদ্দিসাহ, মুফাসসিরাহ, ফক্বীহাহ রয়েছেন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ইলম অর্জন আমাদের পূর্বপুরুষদের রক্তের সাথে মিশে ছিল। ঘুমন্ত জাতির ঘুম ভাঙাতে আমরা এসব আলাপ করব তা ঠিক। কিন্তু আমাদের এটাও মাথায় রাখতে হবে যে, সেকুলারদের সামনে অশিক্ষিত, মূর্খ মুসলিম থেকে জাতে উঠার চেষ্টা করার কোনো দরকার আমাদের নেই, নেই এবং নেই। কারণ আমরা না বরং তারাই অসভ্য, তারাই বর্বর ও তারাই উগ্রবাদী।
ব্রাহ্মণ্যবাদে প্রভাবিত সাধারণ মুসলিম নারী :

দীর্ঘদিন যাবত হিন্দু-মুসলিম একত্রে বসবাস করার ফলে উপমহাদেশীয় মুসলিম সমাজে অনেক হিন্দুয়ানী প্রথার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ইসলামকে আফগানী ও হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির সাথে মিশিয়ে এমন নতুন এক ইসলামের উদ্ভব করা হয়েছে, যে ইসলামে নারী এক বিশেষ তুচ্ছ জাতি এবং পুরুষের ক্ষমতা ও প্রভাব অনেক বেশি। নারী এমন এক জাতি, যাকে পুরুষের ও সমাজের আদেশকে চোখবন্ধ করে মেনে নিতে হবে। শরীয়াহ যা বলেনি তাও স্বামীর আনুগত্যের হাদীসের অপব্যাখ্যা করে তাকে দিয়ে করানো হবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উপমহাদেশে এ প্রথা চলে আসছে।
স্বাভাবিকভাবেই এ টক্সিক পুরুষতান্ত্রিকতা সোজাভাবে বললে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রভাব থেকে আমরা যারা দ্বীন মেনে চলার চেষ্টা করি, তারা সবাই পুরোপুরি মুক্ত নই। উপরোক্ত দুটো শ্রেণীর অনেকেই তৃতীয় শ্রেণীর আওতাভুক্ত সমাজব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে গিয়েই সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। আমরা যারা দ্বীন মেনে চলার চেষ্টা করি, তারা প্রথম দু শ্রেণীর বিরোধীতা করতে গিয়ে এমন অনেককিছুই বলে বসি, যা ইসলামের ভাষ্য নয়। বরং আমাদের সমাজব্যবস্থায় বিদ্যমান ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রভাবমুক্ত হতে পারিনি বলেই আমরা এমনসব কথাবার্তা বলে ফেলি। এসবের অনেককিছুই পুরোপুরি ইসলাম অনুযায়ী হয় না। অথবা মাঝেমধ্যে বেশ বাড়াবাড়ি হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মেয়েদের চাকরি নিয়ে আমাদের অনেকের অবস্থান বেশ সমস্যাপূর্ণ।
আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের সেসকল বোনেরা অনেক বেশি তাক্বওয়াবান। অনেকেই ভালো ইলম রাখেন। এতদসত্ত্বেও তারা স্টেরিওটাইপের বাইরে আসতে পারেন না। আমরা কোনো যদি কিন্তু ছাড়া মেয়েদের চাকরির বিরুদ্ধে না। ইসলাম মেয়েদের জন্য প্রধান স্থান হিসেবে বাড়িকে নির্ধারণ করলেও মেয়েরা প্রয়োজনে বাইরে যেতে পারবে। চাকরিও করতে পারবে। এমনকি নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করে একজন নারী প্রয়োজন না হলেও চাকরি করতে পারবে। ইসলামের বিধান সুস্পষ্ট। তাই আমাদের আপত্তি চাকরিতে না। বরং আমরা নারীর অর্থনৈতিক অবস্থানকে নারীকে পরিমাপের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করে তাকে পুঁজিবাদ ও ভোগবাদের দাসী বানানোর বিরুদ্ধে। অবশ্য একারণেই চাকরির পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাভাবিক অবস্থায় আমরা কিছু কিছু চাকরিরও বিরোধীতা করি। কিন্তু সাধারণভাবে ইসলাম নারীর বাইরে কাজ করাকে উৎসাহিত না করলেও এর বিরুদ্ধে না। শর্ত হলো ইসলাম যেসকল শর্ত দেয়, সেগুলো পূরণ হতে হবে। কিন্তু আমাদের এসকল বোনেরা তা মানতে নারাজ। তারা বড়জোর খুব অভাবে চাকরি করাকে মেনে নিলেও অন্য অবস্থায় মেয়েদের চাকরি করা বা অর্থোপার্জন করাকে খুব খারাপভাবে দেখেন।
এটা শরঈ মানদণ্ডে পুরোপুরি সঠিক অবস্থান না। নিজের জন্য চাকরিকে অপছন্দ করা আর অন্যবোনের বৈধ কাজকে অবৈধ বা অপছন্দনীয় ভাবা এক বিষয় না। স্বাভাবিক অবস্থায় চাকরির নির্দিষ্ট কিছু শর্তের মধ্যে প্রধান চারটে শর্ত হলো,
১। নারীকে তার অভিভাবকের অনুমতি নিতে হবে;
২। চাকরি করে তার সংসারের দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হতে হবে;
৩। তার শরঈ বিধান পালনে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকা যাবে না;
এবং ৪। কর্মস্থলে তার জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা থাকতে হবে।
.
স্বাভাবিক অবস্থায় এ চারটে মূলনীতি ঠিক রেখে মুসলিম নারীরা ঘরের বাইরেও কাজ করতে পারবে ইন শা আল্লাহ। কিন্তু যা আগে বলেছি, আমাদের এ শ্রেণীর বোনেরা তা মেনে নিতে চায় না। তারা বুঝতে চায় না যে, যুহদ প্রয়োজন ও করা উচিত তবে ফরজ নয়। বুদ্ধিবৃত্তিক কলোনিয়ালিজমের যুগে মুসলিম মেয়েরা যেখানে পুরোপুরি দাসীতে পরিণত হচ্ছে ও সেটাকে সম্মান ও মর্যাদার জীবন ভাবছে, সেখানে পর্যায়ক্রমে না বুঝিয়ে আমরা বৈধ তবে আবশ্যক বা সুন্নাহ না এমন কাজকে সাধারণভাবে অবৈধ বানিয়ে দিলে লাভের লাভ তো হবেই না বরং ক্ষতি বাড়বে। তারা বুঝতে চায় না যে, কোনো মুসলিম নারী যদি উপরোক্ত শর্তগুলো মেনে বাইরে কাজ করতে পারেন তবে তা বৈধ। বর্তমানে তৃতীয় শর্ত সর্বস্থরে মানা কতটুকু সম্ভব তা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গ। আমরা বাইরে কাজ করা নিয়ে আলাপ করছি। এর সাথে আনুসঙ্গিক বিষয় যুক্ত হলে ক্ষেত্রবিশেষে হুকুম পাল্টাবেই। কিন্তু পরিবর্তিত হুকুমকে প্রকৃত হুকুম হিসেবে দেখানো বেইনসাফি। একজন মুসলিম নারী কোনো *যদি এবং কিন্তু *ছাড়া উপরোক্ত শর্তগুলো মেনে বাইরে কাজ করতে পারবে।
একথাটা মেনে নিতে শেখাটা ইসলাম মেনে চলা মুসলিমাহদের জন্য খুবই জরুরী। আপত্তির জায়গা বাইরে কাজ করা নয়-তা জানতে ও মানতে হবে। মুসলিম নারীদের বাইরে কাজ করতে বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করা হয়নি। তাই আমরা অবশ্যই অর্থোপার্জনের জন্য বাইরে যাওয়াকে উৎসাহিত করি না। তাছাড়া এখনকার পরিস্থিতি বিবেচনায় যে কোনো সচেতন মুসলিমেরই উৎসাহিত করা উচিত না। কেননা বর্তমান পরিস্থিতিতে একটা মেয়ের কর্মস্থলে তার জীবন ও ইজ্জতের নিরাপত্তা নেই। কর্মস্থলে পর্দার বিধান মেনে চলা, ফ্রি মিক্সিং এড়িয়ে চলা একপ্রকার অসম্ভব। তাই আমরা যেমন স্বাভাবিক অবস্থায় চাকরি করা হালাল কথাটা বলছি, একইভাবে আমাদেরকে এটাও জানিয়ে দিতে হবে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো জরুরী প্রয়োজন ছাড়া চাকরি করা বৈধ নয়।
স্বাভাবিকভাবে এ দায়িত্ব পুরুষের। উত্তম হলো যার যার দায়িত্ব সে পালন করা। একজন মুসলিম নারীর উপর যেসব দায়িত্ব রয়েছে, সেগুলো পালন করে বাইরে কাজ করতে যাওয়াটা অনেকক্ষেত্রেই কষ্টসাধ্য। এতদসত্ত্বেও কেউ যদি তার প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলো পালন করে, উপরোক্ত শর্তগুলো মেনে বাইরে কাজ করতে পারে, তবে সে পারবে। তাকে এজন্য নারীবাদী বলা যাবে না। নারীবাদীরা ঘরের বাইরে বের হয়, কাজ করে। কিন্তু বাইরে বের হলেই কেউ নারীবাদী হয়ে যায় না।
“নারীবাদী” তক্বমার অপব্যবহার মুসলিম নারীদের মধ্যে স্বল্পজ্ঞানী বোনদেরকে পুরুষবিদ্বেষী করে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি এর ফলে এ পরিভাষাটি নিজস্ব গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে। এ ধরণের অপপ্রয়োগের ফলে মুসলিম নারীরা এটিকে স্বাভাবিকভাবে নিতে শুরু করে। তাদের অনেকেই মনে করে যে, “প্রতিবাদী হলেই তাকে নারীবাদী বলা হয়। তাই এই তক্বমা নিজের বা যে কারোর উপর আরোপিত হওয়া একেবারে স্বাভাবিক বিষয়। এতে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই।”
যে মুসলিম নারী বাইরে কাজ করতে যাচ্ছে এবং যে নারী ঘরে থাকছে দুজনেই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাইরে কাজ করতে যাওয়ার কারণে প্রথমজন শ্রেষ্ঠ হয় না। কারণ ইসলামে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি অর্থ নয়। কিন্তু বেশিরভাগ চাকুরিজীবি ও বাইরে কাজ করতে যাওয়া নারীরা মনে করেন তারা গৃহিণীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। সমাজ তাদেরকে সেভাবেই দেখে। আমাদের আলোচ্য শ্রেণীর অনেক বোনেরা দরকার ছাড়া চাকরি বা ঘরে বসে ব্যবসা করা বোনদেরকে একারণেও ভিন্ন চোখে দেখেন। কিন্তু এটা বৈধ ও যৌক্তিক কারণ না। সমাজ দেখছে বলে নিজেরাও যদি হীনমন্যতায় ভোগে, তবে সমাজের এ অনৈতিক আচরণ চলতেই থাকবে। এটাতো নিজেকে সমাজের অন্যায্য দাবীর কাছে আত্মসমর্পণ করা হলো। নিজেরাই যদি হীনমন্যতায় ভোগে তবে দাসত্ব আর হীনমন্যতার জীবন থেকে বেরিয়ে আসাটা কঠিন থেকে কঠিনতর হতে থাকবে।
অবশ্য এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে তার অভিভাবক তথা স্বামী/ভাই/বাবা তাকে কিভাবে দেখে। যদি কোনো নারী উপার্জন করা ব্যতিত গৃহিণী হবার কারণে তার স্বামী তাকে ঘরে বসে খাবার খাওয়া নিয়ে খোঁটা দেয়, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে, ঐসকল দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং আত্মমর্যাদাহীন পুরুষ মানুষদের জগতে মহিলাদের দ্বীন রক্ষা করে চলার আসলেই উপায় নেই। স্বাভাবিকভাবেই এমন পরিস্থিতিতে নারীদের আসলে কিছু করার থাকে না। কারণ তারা তাদের অভিভাবকদেরকে নিজেদের পাশে পাচ্ছে না। তাই এরকম অবস্থায় নারীকে দোষ দেয়া যায় না। বরং কিভাবে পুরুষদের পুরুষ বানানো যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে।
কিন্তু অভিভাবকের সমর্থন থাকলে তবে বিনা প্রয়োজনে শুধুমাত্র ক্যারিয়ায় না থাকার কারণে আবেগে মুর্ছা গিয়ে যারা নিজেদেরকে তুচ্ছ মনে করে, তাদের নিয়ে আমার বড্ড দুঃখ হয়। তাদের ইবাদতে বেশী মনোযোগ দেয়া উচিত। অবশ্য একটা ব্যাপার এখানে মাথায় রাখা উচিত। বোনেরা, যাদের আসলে সত্যিই দরকার নেই, অন্যভাবে বলতে গেলে, যারা “আরেকটু ভালো থাকার জন্য” চাকরি করতে বাইরে যেতে চান, এই “আরেকটু ভালো থাকাটা” আমাদের অনেকের বেলায় নেহাত বিলাসিতা বৈ কিছুই না। আমাদের যত যাই থাক, আরেকটু চাওয়াটা কখনোই ফুরোবে না। আমরা নিজেদের ও সন্তানদের আরেকটু ভালো থাকার চিন্তায় জাহিলিয়্যাহকে বরণ করে নেয়ার কথা বলছি। অথচ এ সন্তান বা আমরা যে আগামী এক সেকেন্ড বেঁচে থাকবো এরই নিশ্চয়তা নেই। আমরা এ পৃথিবীতে “আরেকটু ভালো থাকার” নামে বিলাসীতা করতে আসিনি। বিশেষত এজন্যে যদি আমাদেরকে আদর্শিক দাসত্ব করতে না হতো, তবে সমস্যা ছিল না। এটা তো আমরা আগেই বলেছি। কিন্তু “আরেকটু ভালো থাকার” জন্য আমাদের ভাই-বোনেরা কেবল নিজেদেরকেই ভোগবাদের কাছে সমর্পন করছে তা না, বরং পরবর্তি প্রজন্মকে শিখিয়ে দিচ্ছে যে, “আরেকটু ভালো থাকতে চাওয়া” উচিত। এজন্যে প্রয়োজনে পুঁজিবাদের দাস হওয়া উচিত। আমাদের এ ভাই-বোনেরা ভালো থাকার সঠিক তথা নববী পন্থা নিজেদের জীবনেই বাস্তবায়ন করছে না। তারা মুখে যতই সাহাবি, সাহাবিয়্যাহ, ও সিরাহ নিয়ে আলাপ করুক না কেন, তাদের জীবন থেকে তাদের সন্তানেরা ভোগবাদকে বরণ করে নেয়া শিখবে। ভোগবাদকে বরণ করতে গেলে তাদেরকে পুঁজিবাদের দাস হতে হবে। নিজের একটু “ভালো থাকার” ইচ্ছে পূরণ করতে আমরা আমাদের প্রজন্মের জন্য এই লিগ্যাসি রেখে যাবো?
এটা কি ইসলামের শিক্ষার সাথে যায়? ইসলাম এমন না যে, আপনি একেবারে সন্যাসী হয়ে যাবেন। বরং ইসলাম আপনাকে সাধ্যের মধ্যে সাধ মেটাতে বলে। গরীব হওয়াটা একটা পরীক্ষা, ধনী হওয়াটাও পরীক্ষা। আমরা আজীবন এ দুনিয়াতে থাকব না। আমরা যদি আমাদের পরিবারের আর্থিক সমস্যার কারণে বাধ্য হয়ে নয়, বরং অধিকার পাওয়ার জন্য চাকরি করি, নিজেদের মর্যাদা পাওয়ার জন্য চাকরি করি, তবে আমরা মূলত ইসলামের বদলে পুঁজিবাদকে সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে ধরে নিচ্ছি। আপনার জালিম দাইউস অভিভাবক যা চাচ্ছে তা মেনে নেয়ার অর্থ কিন্তু এ দাসত্বকে মেনে নেওয়া। ইসলাম আমাকে যা বিনামূল্যে দিয়েছে, তা পাওয়ার জন্য আমাদেরকে চাকরি করে নিজেদেরকে প্রমাণ করতে হবে? উদ্যোক্তা হতে হবে? উদ্যোক্তা হওয়াটা কুল? একটা প্র্যাস্টিজের ব্যাপার? কোন প্র্যাস্টিজ? কিসের প্র্যাস্টিজ? আমরা এত্ত কষ্ট করি পুঁজিবাদের দাসত্ব করতে। একই কষ্টটা কেন আমরা পুঁজিবাদী সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করার বিরুদ্ধে করি না? অহ হ্যাঁ! ওটাতো বেশ কঠিন কাজ। আমরা কেবল সোজাসাপ্টাটাই করতে চাই।
কিন্তু আমাদের একটা স্টেপ কেবল পরবর্তি প্রজন্মকেই না, আমাদের সময়ের অনেক বোনের জীবনযাপনকে কঠিন করে দিচ্ছে-এটা ভেবে দেখেছেন? যেসব বোনেরা এ জাহিলিয়্যাহর যুগে মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে চায়, তাদেরকে মূল্যহীন হিসেবে কারা দেখাচ্ছে? আমাদের সেসব বোনেরা যারা কুল হতে, এমপাওয়ার্ড হতে এবং মর্যাদা পেতে চাকরি করছে, উদ্যোক্তা হচ্ছে। যারা ইতিহাসকে বিকৃত করছে তারা। এটাতো হওয়ারই কথা। কারণ তারা এটা বলে না এবং বলতে পারবে না যে, একজন মুসলিম নারীকে পরিমাপের মানদণ্ড অর্থ না। এটা বলতে গেলে তো তারা নিজেরাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে যে, তাহলে কেন তারা কোনো প্রয়োজন ছাড়া অর্থোপার্জনে সময় দিচ্ছে? এটার উত্তর দিতে পারবে না। কারণ সিস্টেমটাই এমন, এটা গ্রহণ করলে জেনেবুঝেই গ্রহণ করতে হবে যে, আমরা দিনশেষে একটা বড় বিপর্যয়কে ডেকে আনছি।
আমরা কেন ও কিভাবে ডেকে আনছি? ব্যাপারটা খুবই সোজা। অতীতের দিকে ফিরে তাকাই। আমাদের মায়েদের তুলনায় এখন কতগুণ মেয়ে চাকরি করতে বাইরে বের হয়ে আসছে? এদের মধ্যে অর্থনৈতিক সমস্যা ঠিক কতজনের? হিসেব করলে দেখা যাবে, অধিকাংশই “আরেকটু ভালো থাকার জন্য” এবং মর্যাদা লাভের জন্য বের হয়েছে। নিজেকে কিছু একটা প্রমাণ করার মানসিকতা থেকে বের হয়েছে। আর এদের ফলে আরো অনেকেই বাধ্য হয়ে সিস্টেমের দাস হয়েছে। তাদের সন্তানেরাও একই শিক্ষাটা পাচ্ছে। এক্ষেত্রে দুটো পথ খোলা আছে। সিস্টেমকে এটা জেনে গ্রহণ করা যে, এতে করে আমরা এটার দাসত্ব করছি। এটা আমাদের মুক্তির ইসলামি পথ না। অথবা দ্বিতীয় পথ, সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করা।
আমরা যদি এ চিন্তাটাকে পাল্টাতে চাই, সবার আগে আমাদের আমলকে পাল্টাতে হবে। কখনোই নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পুঁজিবাদকে আঁকড়ে ধরে পুঁজিবাদকে চ্যালেঞ্জ করা ও পরিবর্তন করা সম্ভব না। আপনারা প্রথমটা নিতে চাইলে এটা জেনে বুঝে নিন। এটাও জেনে নিন যে, আপনাদের জন্য আরো অনেক বোনকে কষ্ট পেতে হবে। আর দ্বিতীয় পদ্ধতিটাকে যদি আপনারা বেছে নিতে চান, এক্ষেত্রে এটা অবশ্যই ঠিক যে, এটা কখনোই একা সম্ভব না। কিন্তু একা সম্ভব না বলে যদি সবাই চুপ করে বসে থাকি তাহলে তো হবে না। আমরা কাল কিয়ামতের মাঠে আল্লাহর সামনে দাঁড়াবো। আমাদেরকে দাঁড়াতে হবে। তখন আমরা কি জবাব দেবো? এই উম্মাহর মেয়েদের জীবন দূর্বিষহ করার পিছনে নিজেদের দায় কি এড়াতে পারবো? এর চেয়ে উত্তম কি এটা না যে, আমরা নিজেরা মানসিক কষ্ট পেয়ে হলেও এই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করি? আমরা কেন আমাদের অভিভাবকদেরকে ধীরে ধীরে দাওয়াহ দেয়ার কথা ভাবছি না! আমরা কেন আল্লাহর কাছে চাইছি না? আমরা ইসলামের চিন্তাটাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিজেদের সাধ্যে যা করতে পারি, সর্বোচ্চটা করে তারপর আল্লাহর সাহায্য কি চাইতে পারি না? আমরা এভাবে কি ভাবতে পারি না যে, আমরা যা করছি আল্লাহর জন্যেই করছি তাই সমাজের আন্টিরা কি টিটকারি দিচ্ছে তা নিয়ে আমাদের ভাবার দরকার নেই।
আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদেরকে পরিমাপের মানদণ্ডটা ইসলামের ধরে দেয়া মানদণ্ডে পরিবর্তন করার চেষ্টা করতে যা করতে হয় করবো। কে কি জুলুম করল আমরা তার পরোয়া করবো না। এ স্বভাবটা আয়ত্ত্ব করা নিঃসন্দেহে কঠিন। কিন্তু যদি একবার আমরা সফল হই, তবে আমাদের কয়েক প্রজন্ম পর হলেও মুসলিম মেয়েরা আমাদের পরিশ্রমের সুফল পাবে ইন শা আল্লাহ। পৃথিবীর যেকোনো আদর্শ প্রতিষ্ঠা বা পুনঃপ্রতিষ্ঠার শুরু এভাবেই হয়েছে। মুমিনাহদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ঠ যে, তাদের রব সর্বোত্তম সুবিচারক।
আমাদের মূল আলাপ তৃতীয় দলটি নিয়ে। তাদের আরেকটি বিরাট সমস্যা হলো, তারা তাক্বওয়ার সাথে ইসলামের বিধানকে গুলিয়ে ফেলে। পর্দার বেলায় কতটুকু বিধান আর বাদ বাকি কতটুকু থেকে তাক্বওয়ার শুরু অনেকেই জানে না। তাই নিজেদের তাকওয়ার মাপকাঠিতে অন্যদেরকে মাপতে শুরু করে। তারা বুঝতে চায় না যে, সাহাবিয়্যাহদের আমলমাত্রই হুজ্জাহ(দলীল) নয়। এব্যাপারটা আমরা দ্বিতীয় দলের দলীল প্রদানের ফ্যালাসি নিয়ে আলাপের সময়ও বলেছিলাম। আমাদের অবশ্যই তাক্বওয়াবান হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু একজন মুসলিম নারী যদি নুসুস (দলীল) অনুযায়ী পর্দা করে, তারপর আমরা তাকে তাক্বওয়ার ঘাটতির জন্য দোষারোপ করতে পারি না। এতে হিতে বিপরীত ঘটে। নাসীহাহ দেয়া এক বিষয়। আর তাক্বওয়ার ঘাটতিকে পর্দার ঘাটতি বানিয়ে ফাতওয়া ঝেড়ে দেয়া ভিন্ন বিষয়। এখানে আমি কোনোভাবেই পর্দা নিয়ে শিথিল হওয়াকে সমর্থন করছি না। বিধান ও বিধানের নামে কোনোকিছু চাপানোর বিরোধীতা করছি।
অনেকে আবার এটাও বুঝতে চায় না যে, পর্দার বিধান পুরুষেরও। বুঝলেও তা তাদের কথা ও আচার-আচরনে প্রকাশ পায় না। পর্দা লঙ্ঘন হবে বলে কোনোকিছু নারীর জন্য হারাম হলে দুয়েকটা ক্ষেত্র ছাড়া পুরুষের জন্যও সেসব হারামই হবে। মূলনীতি তাই বলে। কিন্তু সবকিছু চাপিয়ে দেয়া হয় নারীদের উপর। পুরুষরা এসব ব্যাপারে দায়িত্বমুক্ত সেজে পাশ কাটাতে সক্ষম হয়। এক্ষেত্রে পুরুষদের পাশাপাশি এসব বোনদেরও দায় রয়েছে। তারা কিতাব খুলে দেখে না। অনলাইনে, সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং বাস্তব জীবনে একশ্রেণীর পুরুষরা ইসলামের যে রূপ উপস্থাপন করছে, সেটাকেই প্রকৃত ইসলাম হিসেবে মেনে নিয়ে অন্যদের উপর তা চাপিয়ে দিতে তারা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। এটাকে টক্সিক পুরুষতন্ত্রের প্রভাব না বলে আর কিইবা বলা যেতে পারে? তাকওয়ার মানদণ্ডকে বিধানের মানদণ্ড বিবেচনা করে এ মানদণ্ডে উত্তীর্ণ না হওয়া বোনদের নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, তাদেরকে নিয়ে কথা বলাকে আমরা ইসলামি আচরণ বলে গণ্য করি না, করবো না। আমাদের কাছে এটা সুপ্ত পুরুষতন্ত্র প্রভাবিত অবুঝ তথা প্রজ্ঞাহীন আচরণ বৈ কিছুই নয়।
উদাহরণস্বরূপঃ হিজাব পরিধান করলেও সোস্যাল মিডিয়ায় হিজাব পরে ছবি আপলোড করা যাবে না। কেন? কারণ এতে পর্দার খিলাফ হয়। নিজেকে প্রদর্শন করা হয় ইত্যাদি। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এ কথা যারাই বলছে তারা সত্য বলছে। কিন্তু একই কথা কেন ছেলেদের বেলায় প্রয়োগ করা হয় না? প্রয়োজনে, চেনার জন্য ছেলেরা তাদের বিভিন্ন একাউন্টে একটা ছবি রাখতেই পারে। এটুকু বৈধতা ইসলামে আছে। কিন্তু বিশেষ করে সুদর্শন মুসলিম পুরুষেরা কেন কদিন পরপর নিত্যনতুন পোশাক পরিধান করে হরেক রকমের ছবি আপলোড দেবে? এতে কি বোনেদেরকে ফিতনায় ফেলা হচ্ছে না? একজন হিজাব বা নিক্বাব পরিহিত নারী রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে সেভাবে দেখা সম্ভব না, যেভাবে সোস্যাল মিডিয়ায় তার ছবিতে দেখা সম্ভব। একই কথা তো ছেলেদের জন্যেও প্রযোজ্য। কিন্তু কেন শুধুমাত্র নারীদের নিয়েই আলাপ হয়? এ শ্রেণীর বোনেরা ভাইদের মতো কেন কেবল নারীদের নিয়েই আলাপ করে? কেন একজন পুরুষের বেলায় এসে তাদের অবস্থান মৌন থাকে বা পরিবর্তিত হয়? ফ্রি-মিক্সিংয়ের কারণে ইউনিভার্সিটিতে পড়া যদি কোনো বোনের জন্য হারাম হয় (যেটা আল্টিমেটলি বিতর্ক যোগ্য বিষয়) তবে একই কথা তো পুরুষের বেলায়ও প্রযোজ্য। একজন নারীর লেখনী যদি ফিতনার কারণ হয় (এটা কুযুক্তির পরিসীমা অতিক্রম করা কুযুক্তি), তবে পুরুষের লেখাও তো ফিতনার কারণ হতে পারে। একজন নারীর সোশ্যাল মিডিয়ায় উপস্থিতি যদি ফিতনার কারণ হয়, তবে পুরুষরা সোশ্যাল মিডিয়াতে থাকাটাও তো ফিতনা। কেননা পর্দার বিধান, দৃষ্টির হিফাজতের বিধান তো উভয়ের বেলায় সমানভাবেই প্রযোজ্য। বরং দৃষ্টি হিফাজতের বিধানে পুরুষদের কোনোরকম ছাড় নেই। যদি কিন্তু দিয়ে এখানে নিজের গুনাহকে বৈধতা দেয়া যাবে না। এভাবে আরো বহু উদাহরণ দেয়া যাবে যেখানে একজন নারীর সামনে ইসলামকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, ইসলাম সম্পর্কে স্বল্পজ্ঞান থাকা মানুষেরা এতে করে সহজেই ভুল বার্তা পায় ও বিভ্রান্ত হয়। আমি বলছি না যে, কোনো বিধানে পুরুষদের আলোচনা না আসলে নারী সংক্রান্ত প্রকৃত বিধানগুলো না মানাকে বৈধতা দেয়া যাবে। আমার বক্তব্য হলো, এসকল বোনেরা টক্সিক পুরুষতন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত। তাই তারা কথাতে ব্যালেন্স করতে পারে না।
কিছুক্ষেত্রে তারা ইসলামের নামে অন্যায্য অনেককিছুই মুসলিম মেয়েদের উপর চাপিয়ে দিতে চায়। আর কিছুক্ষেত্রে তারা মুসলিম নারীদেরকে একপেশে করে দেখে। হয়তো তারা ইচ্ছে করে করে না। কিন্তু তাও যা তারা করছে তা তো করছেই। যে বিধান পুরুষের বেলায়ও প্রযোজ্য তা কেবল নারীদের জন্য সাব্যস্ত করে পুরুষদের ব্যাপারটা ইচ্ছে করে বা অনিচ্ছেকৃতভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে। এখানেই শেষ না। এ মানসিকতা যারা রাখে না বলে প্রতিবাদ করে, তাদেরকে হুটহাট মডার্নিস্ট, মডারেট কিংবা নারীবাদী তক্বমা দেয়ার প্রবণতাও অনেকের মধ্যে বিদ্যমান। দিনশেষে তারা প্রথম দুই দল অপেক্ষা অনেক উত্তম হলেও তাদের আদর্শিক মানোন্নয়ন জরুরী। তাদেরকে প্রকৃতার্থে শিক্ষিত ও প্রজ্ঞাবান করে তোলা জরুরী। প্রজ্ঞাহীনতা মুসলিমদের জন্য কল্যাণকর না। প্রত্যেক মুসলিমকেই দ্বীনের দাঈ হতে হবে। আর প্রজ্ঞাবান হওয়া দ্বীনের দাঈ হওয়ার অন্যতম পূর্বশর্ত। মোদ্দাকথা তাদেরকে কথা বলতে শিখতে হবে। কথা বলতে গিয়ে ব্যালেন্স করতে না জানলে চুপ থাকতে হবে।

৪। আদর্শগতদিক থেকে মধ্যমপন্থী মুসলিম নারী :
এ শ্রেণীর বোনেরা আদর্শিক অবস্থানগত দিক থেকে মধ্যমপন্থী। তারা অন্ততপক্ষে ইসলামকে পুরুষ বা নারীর চোখ দিয়ে না দেখে পুরোপুরি ইসলামের চোখে দেখার চেষ্টা করে। উপরোক্ত তিনশ্রেণীর বোনদের তুলনায় তারা আদর্শগত দিক থেকে সর্বাপেক্ষা উত্তম। আবারো বলছি আদর্শগত দিক থেকে। আমার আলোচনা ব্যক্তিগত আমল নিয়ে নয়। এমন হতেই পারে যে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দলের অনেক বোনদের আমল শেষোক্ত দল অপেক্ষা বহুগুণ উত্তম। মানুষের কাজের ব্যাপারে কেবল আল্লাহ তায়ালাই সর্বাধিক অবগত। আরো ভালোভাবে বলতে গেলে, দাওয়াতের ময়দানের জন্য শেষোক্ত দল সর্বোত্তম। তারা মানুষকে আল্লাহ তায়ালার ধরে দেয়া মানদণ্ড অনুযায়ী বিবেচনা করে।
ঐ মানদণ্ড কি?
আল্লাহ তায়ালা বলছেন,
১।
إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ – إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ

নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্য অনুসরণ করতে ও ধৈর্যধারণ করতে উৎসাহিত করে।
২।
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ

নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার।
৩।
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ

যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে?
৪।
وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ

তার চেয়ে উত্তম কে আছে যে আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে আমি মুসলিমদের একজন?
অতএব, প্রথম মানদণ্ড হলো ঈমান, অতঃপর সৎকর্ম সম্পাদন করা, তাক্বওয়াবান হওয়া, অন্যকে দাওয়াহ দেয়া এবং জ্ঞানার্জন করা। শেষোক্ত দলের ব্যাপারে খুব বেশি লেখার প্রয়োজন নেই। কেননা যারা প্রথম তিন দলের আওতাভুক্ত নয়, তারাই এ শ্রেণীর আওতাভুক্ত। তারা এ মানদণ্ডগুলোর ভিত্তিতে মানুষকে পরিমাপ করতে এবং সে অনুযায়ী সম্মান করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে। তারা ইসলামের কোনো বিধান নিয়ে বাড়াবাড়ি যেমন করে না, তেমনি কোনো বিধানের সাথে সমঝোতাও করে না। এমনকি তারা যদি নিজেরা কোনো বিধান নাও মানতে পারে, তারা সত্যকে সত্য বলে স্বীকার করে। নিজেদের কাজকে ইসলামিকরণ করে বৈধতা দেয় না। তারা স্বীকার করে মেয়েদের জন্য সর্বোত্তম স্থান হলো তাদের ঘর। পুরো দুনিয়াটা তাদের কাছে ঘর না। তারা বিশ্বাস করে তারাও আল্লাহর খলিফা কিন্তু সাধারণভাবে কেবল আল্লাহর দাস হিসেবে নারী ও পুরুষের উপর দায়িত্বের পাশাপাশি নারী হিসেবে তাদের দায়িত্ব পুরুষদের দায়িত্ব অপেক্ষা ভিন্ন। তারা মনে করে, আল্লাহ তায়ালা যাকে যা দায়িত্ব দিয়েছেন ততটুকুই নেয়া উচিত। এর বেশি করতে যাওয়া মানে নিজের উপর জুলুম করা। তারা তাক্বওয়াবানদের অধিক মর্যাদা দেয়। কিন্তু তাক্বওয়ার খিলাফ হওয়ার কারণে তারা কাউকে তৃতীয় শ্রেণীর মতো করে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে না। বিধান ও তাক্বওয়ার মাঝে তারা তফাৎ করার চেষ্টা করে। একজন নারী চাকরি করছে না কি করছে না এর ভিত্তিতে তারা কাউকে নিয়ে মন্তব্য করে না। কেননা একজন নারীর শ্রেষ্ঠত্ব বা এর বিপরীত কিছু হওয়ার মানদণ্ড তাদের কাছে ঐ নারীর অর্থোপার্জন না। বরং উপরোক্ত বিষয়গুলোই প্রকৃত মানদণ্ড। ঈমানদারদের মধ্যে যারা অধিক তাক্বওয়াবান তারাই তাদের নিকট শ্রেষ্ঠ। টাকা-পয়সা বা রূপ-সৌন্দর্য কোনোকিছুই তাদের বিবেচ্য বিষয় না। তারা মানুষের ঈমান, আমল, তাক্বওয়া ও জ্ঞানের ভিত্তিতে পদমর্যাদা প্রদান করে ও সম্মান করে।
তারা বিশ্বাস করে যে, ইসলাম female supremacy বা male supremacy দুটোর একটারও পক্ষে না। আবার নারী-পুরুষের পার্থক্যগুলো স্রেফ পার্থক্য না। বরং তারা ‎إنما النساء شقائق الرجال হাদীস এবং الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ আয়াতের মধ্যে ব্যালেন্স করে। তারপর তারা وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ আয়াতের উপর আমল করে। তারা জানে যে, পশ্চিমা যেকোনো মতবাদের লেন্স দিয়ে ইসলাম সম্মত জীবনযাপন করা কিংবা ইসলামের বিধানগুলোকে পলিটিক্যালি কারেক্ট করা যায় না। এধরণের ইচ্ছাপোষণ করা মুসলিমদের ফিতরাতের বিপরীত। কেননা এমনটা বাস্তবে করতে চাইলে মুসলিমরা নামে মুসলিম থাকবে বটে, তবে তাদের জীবনে প্রকৃত ইসলামের অস্তিত্ব থাকবে না। তারা বুঝে যে, তারা বস্তুবাদি বিশ্বব্যবস্থা থেকে চাইলেই হুট করে বের হয়ে যেতে পারবে না। একদিনে এ অবস্থা পাল্টাবে না। কিন্তু তারা চাইলে কখনো না কখনো হবে। অনেক সময় লাগবে। কিন্তু প্রচেষ্টা থাকলে আল্লাহর কৃপায় একদিন ঠিকই হবে। তারা জীবিত অবস্থায় যদি নাও দেখে, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো দেখবে, এজন্যে কাজ করতে হবে,পরিশ্রম করতে হবে। জানতে হবে, পড়তে হবে।
তারা নিজেদেরকে সাধারণ মেয়ে মনে করে না। তাদের কাছে প্রতিটি মুসলিম মেয়েই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা মেয়েরাই মা। আর মায়েরাই উম্মাহর খুটিগুলোকে তৈরি করে ও শক্তভাবে উম্মাহর ভিত্তিপ্রস্তুর নির্মাণ করে। একইভাবে মায়েরা যদি দূর্বল ও বিভ্রান্ত হয় তবে খুঁটিগুলোও দূর্বল ও নড়বড়ে হয়। এদিকটাতে তৃতীয় দলের অনেকের সাথে তাদের সাদৃশ্য রয়েছে।
তারা মেয়েদেরকে পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থায় না মাপারসর্বাত্মক চেষ্টা করে। তারাও নুসাইবা, আঈশাদের গল্প করে। তবে সেটা পশ্চিমা মানদণ্ডে বিশ্বাসী মুসলিম ও অমুসলিমদের সামনে ইসলামকে পশ্চিমা চোখে পলিটিক্যালি কারেক্ট করার জন্যে না। বরং মুসলিম মেয়েদেরকে বুঝাতে যে, মুসলিম মেয়েরা আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো হয় না। তাদের জীবনের লক্ষ্য থাকতে হবে। তাদেরকে সর্বোত্তম হতে হবে, দক্ষ হতে হবে। এজন্যেই তারা একপেশে গল্প করে না। তারা আঈশার জ্ঞানের সাথে সাথে ফাতিমার তাক্বওয়ার গল্পও করে। তারা ফাতিমা বিন্ত আল ক্বাইসের সাহসিকতার গল্প করে। খাদিজার মুদারাবা ব্যবসার চেয়ে খাদিজার শ্রেষ্ঠত্বের কারণ নিয়ে তারা গল্প করে। তারা মুসলিম নারীদেরকে উম্মাহর রত্নগর্ভা মা হিসেবে তৈরি করতে চায়। তারা জ্ঞানার্জনকে দ্বীন-দুনিয়ায় ভাগ করে নিজেদের অকর্মণ্যতা ও অযোগ্যতাকে প্রশ্রয় দেয়া থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখতে চায়।
তাদের সাথে তৃতীয় দলটির সাদৃশ্য এখানে যে, দুটো দলই উম্মাহর জন্য একইভাবে চিন্তিত। তাদের লক্ষ্যেও অনেকটা মিল রয়েছে। তবে দুটো দলের উম্মাহর জন্য কাজ করতে চাওয়ার ধরণ ও পদ্ধতিতে পার্থক্য আছে। দুটো দলের বোনদের চিন্তা করার পদ্ধতিও ভিন্ন, যা সামনের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হবে ইন শা আল্লাহ। অবশ্য দ্বিতীয় দলের কেউ কেউও একইভাবে উম্মাহর বিজয় চায়। কিন্তু আমরা মনে করি তাদের কর্মপন্থাতে ভুল আছে। কেন ভুল তা আমরা ইতিমধ্যে আলাপ করেছি। দ্বিতীয় দলটির অনেকের ব্যাপারটা এমন যে, এরা সমাজের মধ্যবিত্ত ইসলামিস্ট এলিট সোসাইটির মানুষ। তাই তাদের পরাজিত মানসিকতা অনেকের কাছে কুল মনে হয়। কিন্তু কুল হলেই কেউ সঠিক হয় না। শরঈ মানদণ্ডে তাদের অবস্থান ভূল। বরং তাদের অনেকের অবস্থান বড়ধরণের ভুল। যাইহোক, এসকল পার্থক্যের কারণে শেষোক্ত দলটি সংখ্যালঘু। যদিও ৩য় দলটি কিছুটা পদ্ধতিগত ও চিন্তাগত ভুলের সাথে তাদের পথেরই পথিক। কিন্তু তাত্ত্বিক আলাপে শেষোক্ত দলটি স্রোতের বিপরীতের মানুষ। তাই তারা সবার কাছে হয়তো পৌছতে পারে না।
মানবীয় প্রকৃতির কারণে কখনো কখনো কিছুটা ভেঙ্গে পড়লেও, তারা পুরোপুরি আশাহত হয় না। তারা অল্প হলেও দাওয়াহ চালিয়ে যেতে চায়। তারা নিজেদেরকে আরো শক্ত করে গড়ে নিতে এবং অন্যদেরকেও একই স্বপ্নের দিকে আহ্বান করতে চায়। তারা এমন একদল মুসলিম নারী গড়ে তুলতে চায়, যারা সমাজের চোখে সভ্য বা সম্মানিত হওয়ার জন্য কিংবা জাতে উঠার জন্য সন্তান জন্ম দেবে না। বরং তারা এমন সন্তান জন্ম দেবে, যারা আফিয়াদের মুক্ত করে আনবে। এমন সন্তান জন্ম দেবে, যারা কলমের বদলে কলম হাতে নিয়ে ও বুলেটের বদলে বুলেট ছুঁড়ে দিয়ে জবাব দেবে। তারা এমন মেয়ে সন্তান জন্ম দেবে, যারা মানুষের ও নফসের দাসত্বকে মুক্তি না ভেবে আল্লাহর গোলামীতেই তৃপ্ত থাকবে।
তারা বিশ্বাস করে মায়েরা চাইলে অনেককিছুই পারে। তাই তারা স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে একটা এমন সমাজের, যে সমাজে কোনো নারী আর ধর্ষিত হবে না। ঐ সমাজে আফিয়াদের কণ্ঠস্বরকে সন্ত্রাসবাদ বলে রুখে দেয়া হবে না। ঐ সমাজ কোনো মেয়েকে মুনা আল তাহাওয়ী হতে বাধ্য করবে না। তারা ঐ সমাজের স্বপ্ন দেখে, যে সমাজে পুঁজিবাদ থাকবে না। পশ্চিমাব্যবস্থাতো কোনো একদিন ধ্বসে পড়বেই, পড়তে হবে। তারা স্বপ্ন দেখে তাদের সন্তানরাই এ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করবে। পশ্চিমা সভ্যতায় নির্যাতিত প্রতিটা নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধের প্রতি ইনসাফ করা হবে। এ দুনিয়াতেই হবে। আর তারা স্বপ্ন দেখে এ ইনসাফের শুরু কিংবা শেষ অথবা দুটোই তাদের সন্তানদের হাতে হবে। তারা সেভাবেই তাদের সন্তানদের গড়ে তুলবে যেভাবে অতীতের বীর মুসলিম সেনাপতি ও সুলতানদের মায়েরা তাদেরকে লালনপালন করেছে, সেভাবেই যেভাবে ফাতিমা তার সন্তানকে গড়ে তুলেছে। তারা জানে, যে খালি স্বপ্ন দেখলেই হয় না। এজন্য কাজ করতে হবে। পড়তে হবে, জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে। প্রজ্ঞাপূর্ণ নারী হতে হবে। লাগামহীন হলে চলবে না। তারা জানে যে, বর্তমান সমাজে প্রচুর দাওয়াহর দরকার। তারা জানে, তাদের সন্তানদেরকে ছোটবেলা থেকে এ মানসিকতার সাথে বড় করে তুলতে হবে যে, পার্থিব জীবন একটা খেলতামাশা মাত্র। এখানে জাতে না উঠলে, কেউ দাম না দিলেও আমাদের মূল গন্তব্যে এসবের কোনো প্রভাব পড়বে না। মুমিনের একমাত্র লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি, এর বাইরে কিছুই না। এজন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে তাদেরকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
তথাকথিত “আরেকটু ভালো থাকার” চেয়েও বেশি ও অসীম ভালো থাকা জান্নাতীদের জন্য অপেক্ষমান। তারা বিশ্বাস করে যে, এ বিশ্বাসটা তাদের পরবর্তি প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হবে। নিজের সর্বোচ্চটা দিতে হবে আল্লাহর জন্য, আল্লাহর পছন্দ করা পথে। নিজে “আরেকটু ভালো থাকার নামে” বিলাসীতার জন্য না বরং মাজলুমদের ভালো রাখার জন্যে।। তারা জানে একাজটা বেশ কঠিন। কেননা তারা এমন এক বিশ্বব্যবস্থার অধীনে আছে যেখানে এসব চিন্তা করাটাও বিরাট অপরাধতুল্য। তাদের স্বামীরা যদি একই মানসিকতা না রাখে তবে তাদের স্বপ্ন সত্যি করাটা আরো কঠিন হবে। তাও তারা আশাহত হয় না। আসিয়া যদি ফিরাউনের ঘরেই মূসাকে লালন-পালন করতে পারে তবে এ আর কঠিন কি! তাদের সবার স্বামী তো আর ফিরাউন না, বড়জোর কাপুরুষ আর পশ্চিমা ব্যবস্থার দাস হতে পারে। তাই তারা তাওয়াক্কুল করে।
তারা সারা পৃথিবীর আনাচে কানাচে রয়েছে। তারা বিশ্বাস করে, তারা কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসিত হবে। তাই তারা দুনিয়ায় কতটুকু সফল হচ্ছে তা না ভেবে নিজেদের সর্বোচ্চটা পৃথিবীকে, উম্মাহকে দেয়ার জন্য নিজেদের তৈরি করে নিতে চায়। কেননা আল্লাহ তায়ালা তাদের দুনিয়াবী সফলতাকে দেখবেন না। তিনি দেখবেন তারা তাদের সর্বোচ্চ শ্রম ও মেধা কাজে লাগিয়েছে কি না। যদি তারা সফল নাও হয়, তবুও তাদের সর্বোচ্চটুকু দেয়ার জন্য আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই তো উম্মাহর খিদমাহ করতে চাওয়ার মূল উদ্দেশ্য। তাই তারা থেমে থাকে না। অকাজে সময় ব্যয় করে না। তারা নিজেদের মতো আরো অসংখ্য নারীকে তাদের কাফেলায় সংযুক্ত করতে চায়।

নবুওয়াতের পর থেকে মুসলিম জাতি কখনো ১০০ বছর অবধি ইমারাহবিহীন, খিলাফাহবিহীন বসবাস করেনি। আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি যখন মুসলিম ইতিহাসের খিলাফাবিহীন সময় প্রায় ১০০ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। তাই এ সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একবিংশ শতাব্দি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো সত্যিই আগামী প্রজন্ম এমন এক প্রজন্ম হবে, যাদের হাতে উম্মাহ বিজয় লাভ করবে, বিইযনিল্লাহ। আর যদি তাই তাক্বদিরে থাকে, তবে তা হবেই। কোনোকিছুই এ বিশেষ ঘটনাটিকে আটকাতে পারবে না। প্রশ্ন হলো :
আমরা কোন দলে আছি? আমরা কি উম্মাহর ঐ প্রজন্মের মা হওয়ার জন্য নিজেদেরকে গড়ে তুলছি কিংবা অন্তত ঐ মানসিকতা রাখছি? না কি আমরা ফেমিনিস্ট মুসলিমাহ, কুল মডারেট মুসলিমাহ হয়ে একটা সভ্য জীবনযাপন করতে চাচ্ছি? আমরা কি আসলেই উম্মাহর মা হতে চাই না কি পুরুষতন্ত্রের দাসী হয়ে থাকতে চাই? আমরা কি আমাদের পরবর্তি প্রজন্মকেও উপমহাদেশীয় হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি প্রভাবিত সমাজের কিংবা পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার দাসত্ব করতে শেখাবো? না কি কোনোটাই না? আমরা কি কাপুরুষ জন্ম দেবো না কি ইবন ক্বাসিমদের জন্ম দেবো?
আমাদের প্রজন্মের অনেক বোনদের হাতেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাটা থাকে না। কেবল তাদের হাতেই থাকে যারা অর্থোপার্জন করে। এখন আমরা কি করবো? আমরা কি সম্ভাব্য প্রচেষ্টা করবো না নিজেদের অধিকার প্রতিষ্টার জন্য? আমি জানি এ যুদ্ধটা বেশ কঠিন। সবকিছুর পরেও আমাদেরকে হয়তো ফিরাউনের হাতে পড়তে হতে পারে। আমরা যদি আলীর হাতে পড়ি তবে আমরা যেন ফাতিমা হই, আর নেহাত আল্লাহ তায়ালা যদি যুগের ফিরাউনের হাতেই আমাদের পরীক্ষায় ফেলেন, হতাশ হয়ে উদ্দেশ্য বদলে ফেললে চলবে না। আমাদেরকে আসিয়া হয়ে উঠতে হবে। একজন মুসলিম নারী কোন অবস্থায় কেমন হবে তার প্রত্যেকটা নজীর আমাদের ইতিহাসে আছে। তবে আসিয়া আলাইহিস সালাম ব্যতীত বাকিদের ক্ষেত্রে তফাৎটা এই যে, আমাদের সেসকল নারীরা একটা ইসলামী শাসন ব্যবস্থার অধীনে ইসলামি সমাজব্যবস্থাতে ছিল। আর আমরা ঐ ব্যবস্থা ফিরে পাওয়ার জন্য লড়তে চাচ্ছি। তাই আমাদের যুদ্ধটা কঠিন, বেশ কঠিন। এ যুদ্ধে আমরা শামিল হই বা না হই একটা সময় এ যুদ্ধে বিজয় ঠিকই আসবে। যদি আমরা না লড়ি, তবে মাঝখান থেকে আমরা এ কঠিন যুদ্ধে অংশগ্রহণের ফজিলত ও সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হবো।
পুরো লেখাতে আমি বোনেদের দিকটা আলাপ করেছি। তবে শেষ করার আগে একটা কথা বলা জরুরী :
মুসলিম সমাজের ভঙ্গুর অবস্থার দায় যতটা নারীদের ততটাই পুরুষদের। বরং ক্ষেত্রবিশেষে আরো বেশি। নীতিবাক্য, তাত্ত্বিক আলাপে সহজেই জান্নাত দেখানো যায়। কিন্তু বাস্তবতা বেশ কঠিন। এখানে এত্ত এত্ত জুলুমের মাঝে পা পিছলে না পড়াটা আল্লাহর অশেষ রহমতের প্রমাণ বললে খুবেকটা ভুল হবে না। একজন নারীর জন্য যা কঠিন তার অনেককিছুই একজন পুরুষের জন্য সহজ। এতদসত্ত্বেও যে সমাজে পুরুষরা পুরুষ হয়ে উঠতে পারে না এবং স্ত্রীকে আয় রোজগার করার জন্য শাশুড়ীর ও সমাজের খোঁটার হাত থেকে রক্ষা করে তাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মান প্রদান করতে পারে না, সে সমাজে একটি নারীবাদী প্রজন্ম জন্মানোটা অস্বাভাবিক না।
একজন প্রখ্যাত শাইখ যথার্থই বলেছেন, “আমরা যদি আমাদের মেয়েদেরকে কোরআনের আইন অনুসারে সবকিছু বুঝিয়ে না দেই, তবে তারা অন্যকিছু থেকে অধিকার বুঝে নিতে চাইবে। আর সে সুযোগটাই নারীবাদ ও নারীবাদীরা নিয়েছে।”
নিওকলোনিয়ালিজমের যুগে এটাই স্বাভাবিক। এরকম একটা প্রজন্ম পুরুষদের কাপুরুষ হওয়ার কারণেই জন্মেছে। তারা পুরুষের চাপিয়ে দেয়া জুলুমের জবাবে নারীদের পক্ষ থেকে বেয়াড়া ও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতে অবস্থা আরো খারাপ হতে পারে। যে বৈধ কর্তৃত্ব পুরুষ পেয়েও তার মূল্যায়ন করতে পারেনি, তারা আজ পুরুষের ঐ বৈধ কর্তৃত্বকেই চ্যালেঞ্জ করছে। নারীবাদের গ্রহণযোগ্যতাকে বৈধতা দিচ্ছি না। কেন গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে সে কারণটা দেখাচ্ছি। কারণটা যদিও আমরা সঠিক মনে করি না, কিন্তু এটা একটা যৌক্তিক কারণ। জুলুমের বদলে মানুষ জুলুম করে বসে। এটা নতুন কিছু না।
এ উপমহাদেশের বাবা মায়েরা তাদের সাথে তাদের বাবা-মা যা করেছে তা এখন নিজেদের সন্তানদের সাথে করছে। এতে কতটুকু ইসলাম রয়েছে আর কতটুকু জুলুম তা নিয়ে বেশিরভাগ মানুষই ভাবে না। ভাবে না বলেই এ সমাজের ছেলে-মেয়েগুলো একটা অনৈসলামিক গণ্ডীতে আটকে গিয়েছে। আরেকদল আছে এর উল্টোটা করতে গিয়ে সন্তানদেরকে মুক্ত পাখির মতো উড়তে দিয়েছে। ফলে সন্তানরা হয়ে উঠেছে পশ্চিমা ব্যবস্থার পুরোদস্তুর দাস-দাসী। এটাকেই তারা সভ্য জীবন-যাপন হিসেবে ধরে নিয়েছে।
আপনি বা আমিও কি একই কাজটা করতে যাচ্ছি? পরিস্থিতির দাস হবো না কি যত যাই হোক উম্মাহর মা হবো? কোন মানসিকতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছি আমরা?


এ লেখাটিতে যা কিছু ভালো তা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে, আর যা ভুল-ত্রুটি হয়েছে তা আমার পক্ষ থেকে। আল্লাহ তায়ালা আমাকে ও আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আমাদের নিয়্যতকে পরিশুদ্ধ করে নিয়্যত অনুযায়ী চলার তাওফিক দিন। আমাদেরকে শক্ত হওয়ার ও সবর করার তাওফিক দিন। আমরা যেন সিরাতুল মুস্তাক্বিম হতে বিচ্যুত না হই, আমরা যেন ঝরে না যাই, আমিন।

Leave A Comment

You must be logged in to post a comment